ছোটগল্প “একটি হত্যার ইতিকথা”।

author
2 minutes, 18 seconds Read

খুব ভোরেই ডাকাডাকি শুরু হয়ে যায়।
“নাফিজা ওঠ, উঠে হাঁটতে যা।”
“উফ, কী শুরু করলে তোমরা! ভীষণ ঘুম পাচ্ছে, আমাকে একটু ঘুমাতে দাও।”
“সারাদিন তো শরীর ব্যথা নিয়ে চেঁচামেচি করিস। ডাক্তার বলেছে হাঁটতে, ওজন কমাতে। ওঠ এখন।”
“ঠিক আছে উঠছি, তোমরা আর ডাকাডাকি কোরো না। আর মাত্র পাঁচটা মিনিট ঘুমাবো।”
“না, এখনই ঘুম থেকে উঠে হাঁটতে যা। তারপর এসে নাস্তা খেয়ে যত ইচ্ছে ঘুমাস।”
বাসায় সবার ডাকাডাকি শুনে বিছানা থেকে না উঠে পারলাম না। তৈরি হয়ে নিলাম হাঁটতে যাওয়ার জন্য। গেটের বাইরে পা রাখতেই একঝলক ঠান্ডা বাতাস গায়ে লাগল। ভীষণ শীত, চারদিক ঘন কুয়াশায় ঢাকা। তার মধ্যেই হাঁটা শুরু করলাম। রাস্তায় পথচারীদের তেমন দেখা নেই। কুয়াশার কারণে দু-এক কদম সামনে যতটুকু দেখা যায়, ততটুকুই ভরসা। হাত দুটো ঠান্ডায় জমে আসছে। উফ, কী যে শীত! তখনই মনে হলো, হাত দুটো তো সোয়েটারের পকেটে রেখেও হাঁটা যায়।
আমি যখন হাঁটি, তখন ডানে-বায়ে তেমন একটা তাকাই না, নিজের গতিতে চলি। সামনেই বারেক মোল্লার মোড়। মোড়টা পার হয়ে এপারে আসতেই কয়েকটা বাড়ি চোখে পড়ল। আপনমনে হাঁটছিলাম, হঠাৎ একটা গুনগুন শব্দ শুনে থমকে দাঁড়ালাম। তাকিয়ে দেখি, একটা মা কুকুর তার আটটি ছানা নিয়ে গুটিসুটি মেরে বসে আছে। শীতে বাচ্চাগুলো খুব কাঁপছিল। দৃশ্যটা দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেলো। মায়ায় পড়ে গেলাম, ওখান থেকে পা বাড়াতে পারছিলাম না। পাশেই কিছু ইটের খোয়া আর বালুর বস্তা রাখা। সেই ভেজা মাটিতেই মা কুকুরটি তার বাচ্চাদের আগলে বসে আছে। আমি মুগ্ধ হয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে রইলাম, ওরাও বড় বড় চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। মনে হলো ওদের খুব খিদে পেয়েছে। আহা, কী যে করি! তাড়াহুড়ো করে বের হওয়ায় কোনো টাকাও নিয়ে আসিনি যে কিছু কিনে দেব। আবার ওদের ছেড়ে যেতেও মন চাইছে না। মনে মনে বললাম, “ঠিক আছে, আগামীকাল তোমাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করব।” আমি যখন আবার হাঁটতে শুরু করলাম, ওরা আমার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। খানিক দূর গিয়ে পেছন ফিরে তাকাতেই দেখলাম, ওরা তখনও একদৃষ্টিতে আমার দিকেই চেয়ে আছে।
হাঁটা শেষ করে বাসায় ফিরলাম। কিন্তু মন থেকে ওদের চিন্তা কিছুতেই যাচ্ছিল না। বাসায় আমার নিজের পোষা বিড়ালগুলোর সাথে কিছুটা সময় কাটালাম। আমি বাইরে থাকলে ওদের মন ভীষণ খারাপ থাকে, আর আমি বাসায় ফিরলে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়। ওরা আমার মনের ভাষা বোঝে, আর আমিও ওদের চোখের ভাষা দেখলেই বুঝি ওরা কী বলতে চাইছে। আমি ওদের কখনো ‘বিড়াল’ বলে ডাকি না, সবার আলাদা নাম আছে। বিড়াল বললে যেন ওরা কষ্ট পায়, মন খারাপ করে। তবে বাসায় মেহমান আসলে তাদের বোঝানোর জন্য কখনো কখনো ‘বিড়াল’ শব্দটা মুখ থেকে বেরিয়ে যায়। তখন আমি মেহমানদেরও বুঝিয়ে বলি, “ওদের বিড়াল বলবেন না দয়া করে, যার যা নাম, সেই নামে ডাকবেন।”
পরদিন সকালে আর কাউকে আমাকে ডেকে তুলতে হলো না। আজ নিজের তাগিদেই ঘুম থেকে উঠে হাঁটতে বের হলাম। তবে আজ বের হওয়ার সময় কিছু টাকা নিয়ে নিয়েছিলাম। গুটিগুটি পায়ে ওদের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। কিন্তু ওখানে গিয়েই বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। আটটা ছানার মধ্যে তিনটা ছানা নেই! মাত্র পাঁচটা ছানা মায়ের সাথে বসে আছে। আশেপাশে অনেক খুঁজলাম, কিন্তু কোথাও পেলাম না। আহা রে, কী বিচিত্র জীবন এদের! সব দুঃখ-কষ্ট মুখ বুজে সহ্য করে নিতে হয়। না আছে মাথা গোঁজার ঠাঁই, না আছে একটু খাবার। এই তো ওদের জীবন।
কাছের দোকান থেকে কয়েকটা কেক কিনে ওদের সামনে দিলাম। দেখলাম, ওতটুকু বাচ্চা ক্ষুধার্ত অবস্থায় কত আগ্রহ নিয়ে খাচ্ছে। খাচ্ছে আর মাঝে মাঝে ড্যাবড্যাব করে আমার দিকে তাকাচ্ছে। ওদের পেট ভরে খেতে দেখে আমার মনটাও এক অদ্ভুত শান্তিতে ভরে গেলো। মনে মনে বললাম, “ঠিক আছে, তোমরা পেট পুরে খাও।” ছানাগুলো দেখতে মাশাল্লাহ খুব সুন্দর ছিল। এরপর আমি হাঁটতে চলে গেলাম। অনেকটা পথ হেঁটে ফেরার পথে ওদের আবার একটু দেখে বাসায় ফিরলাম। মনে মনে ভাবলাম, “থাকো তোমরা, আগামীকাল আসা-যাওয়ার পথে আবার দেখা হবে।” এভাবে দু-তিন দিন ওদের কেক আর রুটি খাওয়ালাম। কিন্তু পরে মনে হলো, এই শুকনো খাবারে ওদের ঠিকমতো পেট ভরছে না। তার চেয়ে বাসা থেকে ভাত নিয়ে আসলেই তো ভালো হয়।
পরের দিন বাসা থেকে ভাত মেখে নিয়ে গেলাম। ওদের সামনে গিয়ে যখন ভাতটা দিতে যাব, দেখি পাঁচটা ছানার মধ্যে আরও তিনটি নেই! এখন মাত্র দুটি ছানা আছে। চারদিকে অনেক খোঁজাখুঁজি করলাম। তখন ওখানকার একজন দোকানদার বললেন, “তিনটা বাচ্চাই রোড এক্সিডেন্টে মারা গেছে আপা। যেভাবে ওরা ছোটাছুটি করত! আর এই গাড়ির ড্রাইভারগুলো তো দেখেশুনে গাড়ি চালায় না, যে যার মতো বেপরোয়া চালায়।” মনের ভেতরটা হু হু করে উঠল। যে তিনটি বাচ্চা দেখতে সবচেয়ে সুন্দর ছিল, তারাই দুনিয়া থেকে চলে গেল!
আমি আশেপাশের দোকানদারদের অনুরোধ করলাম, “একটু দেখে রাখবেন বাচ্চাগুলোকে।” চায়ের দোকানদার এক মুরুব্বি বললেন, “আচ্ছা, দেইখা রাখুমনে কুত্তাগুলার খেয়াল রাখুম। ওরা খালি ছোটাছুটি করে তো! কত সুন্দর তিনটা বাচ্চা গাড়ির নিচে পইড়া মইরা গেলো! আমি তো খাওন দিতে পারমু না, তবে এমনি চোখে চোখে রাখুমনে।” আমি বললাম, “ঠিক আছে চাচা, আপনি একটু দেখলেই হবে।”
তার পরের দিন গিয়ে দেখি সেখানে আর কেউ নেই। চারদিক শূন্য। মনে বড় ভয় লেগে গেলো—ওরা গেলো কই? একটু দূরে মা কুকুরটাকে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তোমার বাচ্চা কই?” সে ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। মনে হলো, বুকফাটা অনেক অভিযোগ জমে আছে ওর অবলা মনে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর, ওরা আগে যেখানে থাকত, তার থেকে কিছুটা দূরে দুই জায়গায় দুটি বাচ্চাকে দেখতে পেলাম। ওরা আমাকে দেখতে পেয়েই লেজ নাড়তে নাড়তে ছুটে এলো। খাবার দিতেই মা আর ছানা দুটি গোগ্রাসে খেতে লাগল। খাচ্ছে আর কৃতজ্ঞ চোখে আমার দিকে তাকাচ্ছে।
এই দুটি ছানার মধ্যে একজনকে দেখে আমার ভীষণ মায়া হতো। আসলে ওর জন্যই আমার রোজ খাবার নিয়ে আসা। ছানা দুটির একটি জন্ম থেকেই পঙ্গু, সামনের দুটি পা তেমন নাড়াতে পারে না। ও আমাকে দেখলেই আনন্দে কী করবে বুঝে উঠতে পারত না। আমি খুব আপন মনে ওদের দিকে তাকিয়ে রইলাম। এর মধ্যেই চায়ের দোকানদার চাচা এসে ফিসফিস করে বললেন, “এই বাড়ির মালিক ওদের এখানে থাকতে দিতে চায় না। পিটিয়ে তাড়িয়ে দেয়। আমি কিছু বলি না, বললে আবার আমার দোকান নিয়ে সমস্যা করতে পারে।” আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, “কী যে করি চাচা! দেখে ভীষণ মায়া লাগে।” চাচা বললেন, “দেখেন কী করবেন।”
সেদিন থেকে আমি ওদের নাম রাখলাম—’ঝন্টু’ আর ‘মন্টু’। একজন কুচকুচে কালো, আর অন্যজন হলুদ-কালো মেশানো। কালো ছানাটাকে ডেকে বললাম, “তোমাকে আমি আজ থেকে ‘কালু’ বলেও ডাকব।” আমার মনে হলো, নামটা শুনে কালু লেজ নেড়ে সম্মতি দিলো। অল্প দিনেই ওদের প্রতি আমার গভীর মায়া জন্মে গেলো।
এখন রোজ সকালে আমার ছোট বোন খুব আগ্রহ নিয়ে বাসা থেকে ভাত প্যাকেট করে দেয়। কালু-মন্টুর যতটুকু লাগে, ও তার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে দেয়। আমি মাঝে মাঝে বলি, “এত ভাত দিচ্ছিস কেন রে তুই?” ও হাসিমুখে উত্তর দেয়, “আহা দাও না, একবেলা পেট পুরে খাবে। আর যাওয়ার পথে তো আরও কত কুকুর-বিড়াল চোখে পড়ে, ওদেরও কিছু দিও।” সত্যিই, ভাত নিয়ে যাওয়ার পথে রাস্তায় আরও যেসব কুকুর-বিড়াল দেখতাম, তাদেরও কিছুটা করে খাবার দিতাম।
একদিন সকালে এসে দেখি আবার সেই একই অবস্থা, আশেপাশে ওদের কোথাও দেখা যাচ্ছে না। আমি ডাকতে লাগলাম, “ঝন্টু, মন্টু কই তোমরা?” কোনো সাড়াশব্দ নেই। বুকটা কাঁপতে শুরু করল। আবার ডাকলাম, “কালু!” হঠাৎ একটা ‘হো হো’ শব্দ শুনতে পেলাম। আওয়াজটা পেয়ে যেন প্রাণ ফিরে পেলাম। তাকিয়ে দেখি, সামনে একটা বড় জায়গা নিয়ে সীমানা প্রাচীর দেওয়া একটি বাড়ির নির্মাণকাজ চলছে, ভেতরে অনেকটা জায়গা খালি পড়ে আছে। যাক, এখানে থাকলেই ভালো। রাস্তার গাড়ির ভয় অন্তত থাকবে না। দোকানদার চাচা দূর থেকে দেখে বললেন, “হ্যাঁ মা, কুত্তাগুলো ওইখানেই থাকে এখন। ওইখানে থাকলে ওরা ভালো থাকবে।” আমারও তাই মনে হলো। ওদের খাবার খাওয়ালাম, ওরাও সেখানে মনের আনন্দে ছোটাছুটি করতে লাগল। কালুর পায়ে সমস্যা থাকার পরও তার আনন্দের কোনো কমতি ছিল না, খোড়াতে খোড়াতেই ভাইটির সাথে খেলছিল।
পরের দিন ভাত নিয়ে এসে দেখি গেট বন্ধ। ভেতরে কালু আর মন্টু গেটের ফাঁক দিয়ে আমাকে দেখে খুব ছোটাছুটি করছে আর ডাকছে। কিন্তু গেট বন্ধ থাকায় ভেতরে যাওয়ার উপায় নেই। বাধ্য হয়ে আমি পলিথিন গেটের নিচ দিয়ে খাবারটা ভেতরে ঠেলে দিলাম। ঝন্টু, মন্টু আর ওদের মা মিলে খেয়ে নিলো। কিন্তু ওদের কাছে যেতে না পেরে আমার মনটা খুব ছটফট করছিল। এভাবে কিছুদিন চলার পর, ওখানকার দারোয়ান আর কন্সট্রাকশন কন্ট্রাক্টরের সাথে আমার পরিচয় হলো। তারা মানুষ হিসেবে ভালোই মনে হলো, আমি গেটে গেলে গেট খুলে দিত। আস্তে আস্তে দিন পার হতে লাগল, কিন্তু আমি ওদের খাওয়ানো একদিনের জন্যও বন্ধ করলাম না। আমার সারাক্ষণ চিন্তা হতো—আমি যদি খাবার না নিয়ে যাই, ওরা সারাদিন না খেয়ে পথের দিকে তাকিয়ে থাকবে। আমি সামনে গেলেই ওরা আমার পায়ে গা ঘষত, আমার হাত চাটত। আমি তাতে এক স্বর্গীয় আনন্দ পেতাম। আমি গেটে নক করলেই ওরা ভেতর থেকে কুঁইকুঁই করে ডাকতে ডাকতে ছুটে আসত। আমি বলতাম, “চুপ করো, শান্ত হও।” কিন্তু আমি ভেতরে না ঢোকা পর্যন্ত ওদের আনন্দ থামত না। ওদের এই ভালোবাসা ওখানকার অন্য মানুষরাও দেখত এবং আনন্দ পেত। ওদের এই মায়ার টানে আমি দূরে কোথাও বেড়াতেও যেতাম না, ভাবতাম আমার অনুপস্থিতিতে ওদের খাওয়ার খুব কষ্ট হবে।
দেখতে দেখতে রমজান মাস চলে এলো। ভাবলাম, রোজা রেখে এত রোদ আর গরমে হাঁটা হয়তো সম্ভব হবে না, শরীর দুর্বল লাগবে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো, আমি না গেলে ওরা আর ওর মা খাবে কী? তাই রোজা রেখেও আমি প্রতিদিন বারেক মোল্লার মোড়ে ওদের জন্য খাবার নিয়ে যেতাম। কিন্তু ইদানীং লক্ষ্য করছিলাম, ওখানকার দারোয়ান আর কন্ট্রাক্টরের তাকানো বা আচরণ কেমন যেন বদলে গেছে। ওদের ভাবভঙ্গি দেখে আর ওখানে যেতে ইচ্ছে করত না। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ওদের ‘ভাইয়া’ বলে ডেকে সম্মান দেখাতাম, যাতে কুকুরগুলোকে কিছু না বলে। মাঝে মাঝে দারোয়ান বলত, “আজকে খাবার দিতে হবে না, চলে যান। ওরা এখানে নাই।” আমি বলতাম, “ঠিক আছে, আমি একটু ভেতরে গিয়ে দেখি।” আমি ভেতরে পা রাখতেই ওরা কোথা থেকে যেন দৌড়ে চলে আসত। ওরা যখন আসত, আমি দারোয়ানের দিকে তাকাতাম। দারোয়ান তখন চোখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিত।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *