“পিতৃ বিভাজন”

author
0 minutes, 12 seconds Read

মলি বাবাকে ভীষণ ভালোবাসে। তার জগতের পরিধি একচুল এদিক-ওদিক নেই বাবা ছাড়া, যার কেন্দ্রবিন্দুতে কেবলই বাবা আবির আহমেদ। বাবার ছায়াতলে তার বেড়ে ওঠা, বাবার হাসিতেই তার দিন শুরু আর রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে যাওয়া। বাবা ছাড়া সে পৃথিবী বলতে কিছুই বোঝে না; তার কাছে আবির আহমেদ কেবল একজন বাবা নন, তিনি এক অমোঘ রক্ষাকবচ, একজন পরম বন্ধু। আজ কলেজ থেকে বের হয়ে মলির মনের মধ্যে এক অদ্ভুত চাঞ্চল্য কাজ করছিল। সে ঠিক করল, বাবাকে একটা চমক দেবে। বাবাকে না জানিয়েই সে সোজা রওনা হলো মতিঝিলের ব্যস্ত এলাকায়, যেখানে আবির আহমেদের অফিস।
মিরপুর দশ নম্বর থেকে মেট্রোতে ওঠার সময় ভিড়ের প্রচণ্ড চাপে একজনের শাড়ির আঁচল মলির মুখের ওপর এসে পড়ল। মলি পরম আদরে শাড়িটা সরিয়ে দিয়ে হাসিমুখে তাকাল। ওই নারীও লজ্জিত হয়ে তড়িঘড়ি করে বললেন, লক্ষ্য করিনি, বিরক্ত করলাম না তো? ভিড়ে মানুষের কোনো হুঁশ নেই!
মলি বিনয়ের সাথে হেসে বলল, না না, একদমই না। আপনার শাড়িটা তো চমৎকার! শাড়ির রংটা বেশ সুন্দর।
সানজিদাও মলির সহজ হাসিতে আশ্বস্ত হলেন। তিনি বললেন, ধন্যবাদ। আসলে আমারও শাড়িটা খুব প্রিয়। আমি আমার স্বামীর পছন্দের শাড়ি পরি। স্বামীর অফিসে যাচ্ছি। অফিস মতিঝিল।
মলি মৃদু অবাক হয়ে বলল, বাহ, কাকতালীয়! দুজনের গন্তব্য একই, আমিও মতিঝিল যাচ্ছি। বাবার অফিসে। আজ বাবাকে চমক দেওয়ার খুব ইচ্ছে হয়েছে।
এভাবেই মেট্রোর ভিড়ভাট্টা আর যান্ত্রিক শব্দের মাঝে তাদের মধ্যে আলাপ জমে উঠল। কথাবার্তার মাঝে সানজিদা চকলেটের প্রতি তার দুর্বলতার কথা জানালেন। তিনি এক পর্যায়ে ব্যাগ থেকে চকলেট বের করে হাসতে হাসতে বললেন, আমার হাজব্যান্ড আমাকে ছাড়া কিচ্ছু বোঝে না। অফিসের হাজারো কাজের চাপে থেকেও সে আমার জন্য ঠিকই চকলেট নিয়ে আসে। আসলে ভালোবাসা মানেই তো ছোট ছোট এসব আদুরে মুহূর্ত। যদিও সবাই বলে অপরিচিত কারো দেওয়া কিছু খাওয়া ঠিক না, তবুও তোমাকে বলছি, তুমি নিতে পারো। মলি মিষ্টি হেসে মাথা নাড়ল। না আন্টি, এখন কিছু খাব না।বাবার অফিসে যাচ্ছি, বাবার সাথে খাবো। বাবার সাথে খাওয়াটা আমার কাছে সব সময় উৎসবের মতো। যদিও বাবা জানেন না আমি আসছি।
সানজিদা কৌতূহলী হয়ে বললেন, বাবাকে এত ভালোবাসো?
মলি উজ্জ্বল চোখে, গর্বিত কণ্ঠে বলল, বাবাই তো আমার পৃথিবী। আমি কখনো বাবাকে না জানিয়ে তার অফিসে যাইনি। আজ হঠাৎ ইচ্ছে হলো, তাই চলে এলাম।
সানজিদা উচ্ছ্বাস নিয়ে বললেন, আমিও যাচ্ছি আমার স্বামীর অফিসে। সে আমাকে ছাড়া এক মুহূর্তেও থাকতে পারে না। সশরীরে হাজির না হলে তার নাকি কাজে মনোযোগ আসে না। আমি ভাবি, প্রযুক্তির যুগে ভিডিও কলে কাথা বালা যায়, কিন্তু তার বায়না—সশরীরে হাজির হতেই হবে।
মলি মুগ্ধ হয়ে শুনল। তাদের দু’জনের মধ্যে যেন এক অদ্ভুত আত্মীয়তা তৈরি হলো। মেট্রোর ভ্রমণটা যেন রূপকথার মতো মনে হতে লাগল। মলি নিজের মনের কোণে জমে থাকা একটা কষ্টের কথা শেয়ার করল। তার বান্ধবী রেশমা খুব মেধাবী, কিন্তু ওর বাবা পরিবার ছেড়ে চলে যাওয়ায় ওর মা অত্যন্ত কষ্টে সংসার চালাচ্ছেন। পিকনিকের টাকাটা জোগাড় করতে পারছে না বলে রেশমা যেতে চাইছে না। মলি আজ বাবার কাছে আবদার করে রেশমার টাকাটা সে চেয়ে নেবে। বাবা কখনও তার কথা ফেরান না।
সানজিদা মলির মানবিকতায় মুগ্ধ হয়ে বললেন, তুমি খুব ভালো একটা মেয়ে মলি। তোমার মতো এরকম সবাই যদি হতো পৃথিবীর ঝরে যাওয়া রেশমার জীবন সুন্দর হতো, তবে হয়তো অনেক রেশমারাই মাঝপথে পথ হারাত না।
মতিঝিল স্টেশনে নেমে দু’জন বিদায় নিলো। মলি এক তোড়া রজনীগন্ধা ফুল কিনে বাবার অফিসের লিফটের দিকে ছুটল। অফিসের পিয়ন গোবিন্দ মলির দিকে তাকিয়ে থতমত খেয়ে গেলো। আপুমনি! আপনি? স্যার তো, স্যার তো।
কী গোবিন্দ ভাই? স্যার তো, স্যার তো। এমন বলছো কেন? মলি আঙুল দিয়ে ঠোঁট চেপে ইশারা করল। কাউকে বলতে হবে না গোবিন্দ ভাইয়া, আমি বাবাকে চমকে দেব।
মলি সোজা বাবার দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। কিন্তু দরজা খুলতেই মলির হাতের ফুলগুলো থরথর করে কাঁপতে লাগল। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেলো সামনের দৃশ্যে—তার বাবা আবির আহমেদ এবং একটু আগে মেট্রোতে দেখা হওয়া সানজিদা—উভয়েই সেখানে! সানজিদা আলতো করে আবিরের কাঁধে হাত রেখে নিবিড়ভাবে কথা বলছিলেন।
মলি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তার কণ্ঠ দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। সে অস্ফুটস্বরে ডাকল, আন্টি? আপনি এখানে? আপনি তো বললেন, আপনি আপনার স্বামীর অফিসে যাবেন?
আবির আহমেদ মলির কণ্ঠস্বর শুনে লাফিয়ে উঠলেন। তার মুখটা মুহূর্তের মধ্যে ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। সানজিদাও ততক্ষণে মলির চেহারা দেখে জমে গেছেন। পুরো অফিসে যেন এক গভীর নিস্তব্ধতা নেমে এলো।
মলি যেন তখন কেমন লাগছিল। তার সাজানো পৃথিবীটা নিমেষে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেলো। তার হাত থেকে ফুলের তোড়া আর কলেজ ব্যাগটা শব্দ করে মেঝেতে পড়ে পরক্ষণেই মলি মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। অফিসের হট্টগোল আর শোরগোলের মাঝে পানি ছিটিয়ে জ্ঞান ফেরানো হলো মলির। সে দেখল আবির আহমেদ করুণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছেন, তার চোখে অসহায়ত্ব। মলি নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে বসল। তার চোখে অশ্রু নেই, আছে এক গভীর শূন্যতা। সে শান্ত অথচ কাঁপাকাঁপা স্বরে বলল, বাবা, আমি জানতাম আমার পৃথিবীটা খুব নিরাপদ। কিন্তু সেই পৃথিবীর অর্ধেকটা যে অন্যের, তা জানলে আমি কোনোদিন তোমার অফিসে আসতাম না।
আবির কথা বলার চেষ্টা করলেন, মলি, মা শোনো…
মলি তাকে থামিয়ে দিলো। সানজিদাকে বললো, আপনি আদর্শ স্বামীর কথা বলছিলেন না? আপনার স্বামীর অফিস মানেই তো আমার বাবার অফিস। আমি ভাবতাম আমার বাবা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ। তিনি সবার কাছে ভালো মানুষ হতে পারেন, কিন্তু তার হৃদয়ের একচ্ছত্র অধিকার শুধু আমারই ছিল। আজ দেখলাম, সেই হৃদয়েও ভাগাভাগি হয়ে গেছে।
মলি উঠে দাঁড়াল। তার পায়ের নিচে মাটি কাঁপছে। সে বাবার দিকে তাকিয়ে শেষবার বলল, আমি রেশমার বাবার মতো কাউকে চাইনি, তাই তোমার সবটুকু ভালোবাসা আমার দরকার ছিল। কিন্তু আজ বুঝলাম, তুমি সবার জন্য ভালো মানুষ হলেও, একজন সন্তানের বাবার পূর্ণ মর্যাদা হয়তো তোমার নেই। আমি বাবার ভাগ কাউকে দিতে চাই না। আজ থেকে তুমি আমার কাছে শুধু একজন রক্তমাংসের মানুষ, আমার সেই আদর্শ বাবা আজ অফিসেই মারা গেছেন। কিন্তু সেই মুখটা এখন আর তার কাছে চেনা লাগে না। রেশমার জন্য টাকা চাওয়ার কথাটাও এখন বিদ্রূপের মতো লাগছে—যেখানে নিজের সম্পর্কের ভিত্তিটাই নড়বড়ে, সেখানে অন্যের উপকার করার স্বপ্ন কতটাই না হাস্যকর!
মলি বেরিয়ে এলো। বাইরে তখন ব্যস্ত শহর। রোদ ঝলমলে মতিঝিলের রাস্তাটা তার কাছে এখন মরুভূমির মতো ধূসর লাগছে। সে বুঝতে পারল, সে আজ পিতৃত্বের এক বড় মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। তার পৃথিবীটা এখন নিঝুম, পাথরের মতো ভারী। প্রিয় মানুষটার মুখটা বারবার মনে পড়ছে, মলি হাঁটছে, কিন্তু গন্তব্য জানা নেই। তার মাথার ভেতরে বাজছে সেই একই সুর—বাবার ভাগ, তার একান্ত বিশ্বাসের ভাগ। এই ভাগাভাগি সে কোনোভাবেই মানতে পারছে না। জীবনের সবচেয়ে বড় চমক আজ তাকে দিয়ে গেলো তার প্রিয় বাবা। রেশমার বাবা পরিবার ছেড়ে চলে গেছে, আর মলির বাবা ঘরে থেকে অন্য এক জগতে সংসার পেতেছে। দুটোর মধ্যে পার্থক্য সামান্যই; এক জায়গায় অনুপস্থিতি কষ্টের, আর অন্য জায়গায় উপস্থিতি মিথ্যার। মলি হাঁটতে থাকল, একলা। তার প্রিয় মানুষটার ছায়া এখন আর তাকে ছায়া দিচ্ছে না, বরং তার মাথার ওপর তৈরি হয়েছে এক গভীর অন্ধকার। তুমি হয়তো অনেক কিছুতেই জয়ী হয়েছ, কিন্তু আজ তুমি তোমার সন্তানের বিশ্বাসের কাছে হেরে গেছো। ভালোবাসি বাবা! বড্ড ভালোবাসি তোমায়। কিন্তু এই ভালোবাসার আড়ালে আজ যে যন্ত্রণা নিয়ে যাচ্ছি, তা কোনো দিন ভুলবার নয়!
মলির পৃথিবীটা এখন নিঝুম, পাথরের মতো ভারী। নিজের বাবাকে অন্য কারো সাথে ভাগ করে নেওয়ার তিক্ত বাস্তবতা মেনে নেওয়া। কিন্তু মলি কি তা পারবে? সেই প্রশ্নের উত্তর কেবল সময়ের কাছেই তোলা রইল।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *