“অনভ্যস্ত সমবেদনা”

author
1 minute, 18 seconds Read

যে কারো সঙ্গে খুব সহজেই আলাপে মেতে ওঠেন বিথী আপু। ঘুরে বেড়ানো তার স্বভাব। তাঁর কাছে জীবনের অর্থ হলো এটিকে পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করা, কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে নিজেকে আটকে না রাখা। ঘুরে বেড়ানো, খাওয়া-দাওয়া করা আর আড্ডায় মুখরিত থাকা তাঁর পছন্দ। স্বামী, সন্তান, অফিসের সহকর্মী কিংবা বন্ধুবান্ধব, সবার সঙ্গেই তাঁর বাইরে যাওয়ার ঝোঁক প্রবল। তাঁর ভাষায়, এই বয়সে যদি ঘোরাফেরা না করি, তবে কি বুড়ো বয়সে করব? তাই জীবনটাকে ষোলো আনা উপভোগ করতে চাই।
একদিন তিনি আমাকে অফিসে ফোনে ডাকেন। ছোট ভাই, আসো না, আমার অফিসে এসে এক কাপ চা খেয়ে যাও। আজ থাক আপু, অন্য কোনো দিন যাব। আরে ধুর! বড় আপু বলছি না? বলছি চলে আসতে চলে আসবা। আসলে আপু, হাতে একটু কাজ আছে। আচ্ছা ঠিক আছে, অন্য কোনো দিন সময় করে এসো।
এর দু-একদিন বাদে আপু আবার ফোন করলেন। বললেন, আসো, অফিসে এসে চা খেয়ে যাও। আর না বলতে পারলাম না; সোজা হাজির হলাম তাঁর অফিসে। পৌঁছাতেই তিনি হাসিমুখে বললেন, তাহলে এলে? হ্যাঁ আপু।
কথায় কথায় নানা বিষয়ের অবতারণা করলেন তিনি, আর তার ফাঁকেই চালিয়ে গেলেন নিজের দাপ্তরিক কাজ। কিছুক্ষণ পর জিজ্ঞেস করলেন, “চা হবে তো নিশ্চিত? না আপু। কেন? চা খাও না বুঝি? না। বাহ, চমৎকার তো! আমি তো চা ছাড়া বাঁচিই না। চায়ের কথা মনে পড়লেই না খেয়ে থাকতে পারি না। আমি তো একেবারে মগ ভরে চা খাই।
অফিসের কাজ গুটিয়ে তিনি বললেন, চলো, নিচে যাই। নিচে নেমে তিনি জানতে চাইলেন, কী খাবে বলো? না আপু, আমি কিছু খাব না। ধুর পাগলা! আপুর কাছে এসেছো আর কিছু না খাইয়ে ছেড়ে দেব নাকি? ঠিক আছে, তবে আইসক্রিম খাই চলুন। বেশ, চলো দুই ভাই-বোন মিলে আইসক্রিম খাওয়া যাক।
পাশেই ছিল একটা দোকান। আইসক্রিম হাতে নিয়েই আমি সঙ্গে সঙ্গে দোকানদারকে টাকা পরিশোধ করতে গেলাম। তা দেখে বীথি আপু তো বেজায় রেগে গেলেন। তুমি কেন বিল দিতে গেলে? কেন আপু, আমি কি বিল দিতে পারি না? তাছাড়া আমি তো আর বেকার নই, আমিও তো চাকরি করি! আরে, আপুর কাছে এসেছো, বিল কেন তুমি দিবে? আচ্ছা ঠিক আছে, হয়েছে, সামনে আর দেব না।
এরই মাঝে তাঁর কিছু পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। আপু তাদের সঙ্গে আলাপ শুরু করে দিলেন। আমি একা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। রাস্তার পাশে ছোটখাটো একটা বাগানঘেরা বসার জায়গা ছিল। যা সরকারের পক্ষ থেকেই করা। আপু তাদের সবাইকে নিয়ে সেখানে বসলেন এবং এমনভাবে আড্ডায় মগ্ন হলেন, যেন ভুলেই গেলেন পাশে আমি আছি।
আমি দ্বিধা ও সংকোচে পড়ে গেলাম। একধরনের আড়ষ্টতা কাজ করছিল মনে। তবুও সংকোচ কাটিয়ে বললাম, “আপু, আমি তাহলে আসি। আরে না না জিহান! বসো, তুমিও সবার সঙ্গে গল্প করো। না আপু, বাসায় ফিরতে হবে। আরে বিয়ে-শাদি তো করোনি এখনো, এত কিসের তাড়া? না আপু, মা চিন্তা করবেন। বেশি রাত করে বাইরে থাকা মা পছন্দ করেন না। বলে দিবে, আমার সাথে দেখা হয়েছিল বলেই একটু দেরি হয়েছে।
অগত্যা চুপ হয়ে গেলাম। তারা পুরোদমে গান-বাজনা আর আড্ডায় মেতে উঠলেন। আমার তখন আর ভালো লাগছিল না, বেশ বিরক্তিই ধরছিল। গল্প করতে করতে ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত সাড়ে দশটা। বারবার তাগাদা দেওয়ার পর তবে আপু আড্ডা থামালেন। চলো জিহান, এবার তবে যাওয়া যাক।
বাসা ফেরার পথ আমাদের রাস্তা একই। আমি একটা সিএনজি ঠিক করলাম এবং দু’জনে তাতে উঠলাম। কিন্তু পথিমধ্যে আপু তাঁর এক বন্ধুকেও সিএনজিতে তুলে নিলেন। কিছু দূর যাওয়ার পর সেই ভদ্রলোক নেমে গেলেন। আরও কিছুটা পথ অতিক্রম করার পর আপু বললেন আমি যেন তাঁর বাসার সামনে নামিয়ে দিই। কথামতো তাই করা হলো। তাঁকে নামিয়ে আমি যখন নিজের বাসায় পৌঁছলাম, তখন ঘড়িতে রাত সাড়ে এগারোটা বেজে গেছে। মনে মনে ভাবলাম, আর আপুর সাথে দেখা করব না, অহেতুক রাস্তাঘাটে সময় নষ্ট হয়।
দরজায় কড়া নাড়তেই মা দরজা খুলে বললেন, কিরে জিহান, এত রাত হলো যে? মা, বীথি আপুর সাথে দেখা হয়েছিল, তাঁর সাথে কথা বলতেই একটু দেরি হয়ে গেল। ও আচ্ছা! ঠিক আছে, হাত-মুখ ধুয়ে খেতে বসে পড়, মা আর বেশি কিছু জিজ্ঞেস করলেন না।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে অফিসের প্রস্তুতি নিচ্ছি। এমন সময় মা বললেন, বাবা, আগামী শুক্রবার আমাদের একটা বিয়ের দাওয়াত আছে। ঠিক আছে মা। বলে আমি অফিসে চলে গেলাম।
নির্ধারিত শুক্রবার আমরা বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হলাম। আম্মার সাথে আমার বড় ভাই আকরাম ও আমি গেলাম। সেখানে গিয়ে দেখি বীথি আপুও উপস্থিত! আম্মুকে দেখতে পেয়ে তিনি তো ভীষণ খুশি। আম্মুর হাত ধরে শুরু করলেন অনর্গল কথা। খালাম্মা, খালাম্মা বলে মুখরিত করে তুললেন চারপাশ। একদিন আমার বাসায় যাবেন ইত্যাদি নানা কথা বলতে লাগলেন। না মা, আমার কোথাও যাওয়া হয় না। আপনাকে আমাদের বাসায় যেতেই হবে। ঠিক আছে খালাম্মা? হ্যাঁ যাব।
এরই মাঝে আমাদের খাবার দিলো। খাবারের টেবিলে বীথি আপু আমাদের পাশেই বসলেন। তাঁর কথা যেন ফুরানোর নয়, খাওয়ার সময়ও তিনি বক বক করে চলেছেন। মা, এবার একটু খেয়ে নাও, পরে কথা হবে, আম্মা মৃদুস্বরে বললেন।
আমাদের খাওয়া প্রায় শেষের পথে। আম্মা একটু ধীরে ধীরে খান। এমন সময় কয়েকজন ভিক্ষুক মহিলা খাবারের প্যান্ডেলে ঢুকলেন এবং উচ্ছিষ্ট খাবার সংগ্রহ করতে লাগলেন। এক মহিলা আম্মার সামনে থেকে খাবার নিতে গেলে বীথি আপু নাক সিঁটকে বলে উঠলেন, ইশ! সামনে থেকে সরো তো বাবা! কী বিচ্ছিরি গন্ধ!
বীথি আপু যে প্লেটে খেয়েছেন, সেখানেও বেশ কিছু খাবার রয়ে গেছে। এক নারী সেই প্লেটের দিকে হাত বাড়াতেই আপু চটজলদি তার ওপর পানি ঢেলে দিলেন। এ কী করলে মা! আম্মা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, তোমার তো খাওয়া শেষই। প্লেটে যে খাবার রয়েছে, উনি নিলে কী এমন ক্ষতি? কেন তুমি তার ওপর পানি ঢেলে দিলে? খালাম্মা, দেখেন না ওর গা থেকে কী দুর্গন্ধ আসছে! মা, তুমি আগে নিজের মনের ভেতরের দুর্গন্ধ দূর করো, তবেই দেখবে চাপাশের সবকিছু সুন্দর, আম্মা শান্ত কিন্তু শক্ত গলায় বললেন।
ততক্ষণে টেবিলে পড়ে থাকা বাকি খাবারগুলোও অন্য লোকজন নিচে ফেলে দিতে শুরু করল। এবার আম্মার রাগ চরমে উঠল। ওরা তো ভালো খাবার নিচ্ছে না, উচ্ছিষ্টগুলোই কুড়াচ্ছে। খাবারগুলো নিচে ফেলে দিচ্ছ কেন তোমরা? দেখছেন না, ভিক্ষুকরা খাবার তুলে নিচ্ছে! ওদের হাতে এই টেবিলের খাবার না পড়াই ভালো, পাশ থেকে কেউ একজন বলল।
বৃদ্ধা ভিক্ষুক নারীটি একদৃষ্টিতে অপলকে তাকিয়ে রইলেন। আম্মা আর এক মুহূর্তও সেখানে থাকতে চাইলেন না। জলদি বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে বেরিয়ে এলেন। পেছন থেকে বীথি আপু ডেকে উঠলেন, এত তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছেন? থাকেন না আরও কিছুক্ষণ গল্প করি। না, বাসায় যেতে হবে। বলেই আমরা দ্রুত প্রস্থান করলাম।
এরপর থেকে বীথি আপুর সাথে আমার আর সচরাচর দেখাসাক্ষাৎ হয় না।
একদিন অফিস শেষে বাসায় যাওয়ার জন্য বাস স্থানে বাসের অপেক্ষা করছি। হঠাৎ পেছন থেকে কেউ আমার শার্টের কলার ধরে টান দিলো। হ্যাঁচকা টানে আমি অনেকটা পেছনের দিকে হেলে পড়লাম। ফিরে দেখি বীথি আপু মুচকি হেসে বলছেন, আরে জিহান! তুমি? যাক, দেখা হয়ে গেল! হ্যাঁ আপু, দেখা হলো। কী রে, আপুর কোনো খোঁজ-খবরই রাখো না! সেই যে সেবার দেখা হয়েছিল। আর বলবেন না আপু, কাজের ব্যস্ততায় আর হয়ে ওঠেনি। চল, কিছু খাওয়া যাক। না আপু, এখন আর কিছু খাব না। সে কী রে! চা তো আমার খেতেই হবে!
তাঁর নাছোড়বান্দা জিদের মুখে শেষ পর্যন্ত আর না বলতে পারলাম না। চায়ের দোকানে গিয়ে তিনি চা অর্ডার করলেন। চা খেতে খেতেই শুরু হলো তাঁর চিরচেনা কথার ফুলঝুরি। কী জিহান, তুমি চা খাবে না? না আপু, আমার ইচ্ছে করছে না। তাহলে অন্য কিছু খাও।
অফিস শেষে আমার মন পড়ে থাকে বাসার দিকে। এদিক-সেদিক অযথা সময় নষ্ট করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে আমার থাকে না। অথচ আজ আপুর কারণে এখানে বসে থাকতে হচ্ছে। তিনি বেশ দীর্ঘ সময় নিয়ে ধীরে-সুস্থে চা শেষ করলেন। এরপর আমরা দুজনে বাসে উঠলাম এবং নির্দিষ্ট স্থানে নেমে পড়লাম।
একটু দূরে আসতেই চোখে পড়ল একটা অসুস্থ কুকুরকে। ক্ষুধার তাড়নায় সেটি কাত হয়ে পড়ে আছে এবং করুণ চোখে পথচারীদের দিকে তাকাচ্ছে, যদি কেউ একটু খাবারের টুকরো বাড়িয়ে দেয়। দৃশ্যটি দেখে আমার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। আশপাশে কোনো খোলা দোকানও দেখতে পেলাম না। এ অবস্থায় অসহায় প্রাণীটিকে ফেলে যেতে আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল। কী রে জিহান, তুমি এদিক-ওদিক কী দেখছো? আপু জিজ্ঞেস করলেন। আপু, দেখ না কুকুরটা কী ক্ষুধায় কষ্ট পাচ্ছে! কেন, ও কি মুখ ফুটে তোমাকে বলেছে আমাকে খাবার দাও? মুখ ফুটে না বললেও ওর চোখের আকুতিতে আমি বুঝতে পারছি আপু। চলো তো।
আপুর কথামতো আমি হাঁটতে শুরু করলাম। কিছুটা দূরে গিয়ে একটি দোকান পেলাম, যেখানে রুটি ও কেক বিক্রি হয়। যাক, অন্তত একটা দোকান তো মিলল। আপু, তুমি এখানে একটু দাঁড়াও, আমি একটা রুটি আর কেক কিনে ওকে খাইয়ে আসি। না, না, না! আমার হাতে এত সময় নেই, বাসায় গিয়ে রান্না করতে হবে।
কী অবাক কাণ্ড! যে মানুষটি সারাক্ষণ আড্ডায় মেতে থাকে, কাউকে পেলে সে প্রহর গুনতে ভুলে যায়, যার সময়ের দিকে কোনো খেল থাকে না আজ সে একটা পশুর জন্য একটুখানি অপেক্ষা করতে নারাজ! ঠিক আছে জিহান, তুমি তোমার মতো যা করার করো, আমি বাসায় গেলাম। এসব কুত্তা-বিড়াল আমার ভালো লাগে না। বলেই তিনি দ্রুত পা বাড়ালেন।
আমি দোকান থেকে রুটি কিনতে গেলাম। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখি, বৃষ্টির ছোঁয়ায় কেক-রুটিগুলো একেবারে চুপসে নষ্ট হয়ে গেছে এবং থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। দোকানদার ভাই, আপনার এই কেক-রুটি তো সম্পূর্ণ ভেজা ও নষ্ট! দোকানদার মেজাজ হারিয়ে বললেন, নিলে নেন, না নিলে না নেন! কত মানুষ এগুলো কিনে নিয়ে যায় রাতে যারা রিকশা চালায়, তারা এসে এগুলোই খায়!
না, নষ্ট ও বাসি খাবারটি আর কেনা হলো না। মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল; বুঝলাম কুকুরটির ভাগ্যে বুঝি আজ খাবার জোটেবেনা।
ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বাসার পথ ধরলাম। খানিক দূর এগোতেই দেখতে পেলাম, বীথি আপু রাস্তার পাশে কয়েকজন লোকের সঙ্গে দাঁড়িয়ে দিব্যি হেসে হেসে গল্প করছেন। অথচ একটু আগে যিনি বাসার তাড়ায় অস্থির হয়ে পড়েছিলেন, তিনি এখন দিব্যি অন্যদের সঙ্গে আড্ডায় মশগুল!
আপু আমাকে দেখতে পাননি। আমি চুপচাপ তাঁর পাশ দিয়ে হেঁটে চলে গেলাম। অদ্ভুত এক অভিমানে আমার বুকটা ভারী হয়ে উঠল। মনে মনে ভাবলাম, এই মানুষটির সঙ্গে আর দেখা করব না। যে ক্ষুধার্ত একটি অসহায় প্রাণীর পাশে দাঁড়ালো না, একটু সামান্য সমবেদনা হলো না , তার মুখের বুলি আর সময়ের অজুহাত কেবলই প্রহসন ছাড়া আর কিছু নয়। ব্যথা বিচিত্র রূপে হৃদয়কে ব্যথিত করে বিচিত্র মানুষের বিচিত্র অনুভূতিতে।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *