সকালে রেমা ঘুম থেকে উঠে দেখল তার বাবা রুমের মধ্যে হাঁটাহাঁটি করছে। মনে মনে ভাবল— ও বাবা, তুমি আমাকে পাহারা দিচ্ছ? দিতে থাকো, একদিন দেখবে আমি ঠিকই পালিয়েছি। তখন কী করবে বাবা? রেমা বাবার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়।
বাবা, তুমি ঘুমাওনি? নাকি ঘুম থেকে তাড়াতাড়ি উঠলে?
আজ একটু তাড়াতাড়ি উঠলাম।
চলো বাবা, ছাদে গিয়ে ভোরের পাখি দেখি?
চল তাহলে। বাপ—মেয়ের কথা শুনে মা এসে যোগ দেয়। আনান অহনাকে বলে, তুমিও চলো।
আমি রুম থেকে শুনতে পেলাম তোমরা ছাদে যাচ্ছ তাই চলে এলাম।
দেখো পাখিগুলো আমাদের দেখে ডাকছে। ওরা বুঝতে পেরেছে যে আমরা ওদের দেখতে এসেছি। বলল রেমা।
পৃথিবীতে যা কিছু আছে, যখন সে বুঝতে পারে তার কদর আছে তখন সে আনন্দ পায়। তাই পাখিগুলো আমাদের দেখে ডেকে আনন্দ পাচ্ছে। আনান বলল।
অনেকক্ষণ ছাদে কাটিয়ে ওরা বাসায় ফিরে এলো তিন জন। ফ্রেশ হয়ে একসাথে নাস্তার টেবিলে বসলো, নাস্তা খেয়ে রুমে গেল। আনান অফিসে গেল। রেমা ভাবল, বাবা মার এ ভালোবাসা রেখে কোথায় আমি যাবো? কিন্তু আমার না যেয়েও তো উপায় নেই। তাহলে আমার রবিনকে হারাতে হবে। আমি তো রবিনকে হারাতে পারব না। আমি যে ওকে অনেক ভালোবাসি। ওকে ছাড়া আমার জীবনের গতি স্তব্ধ হয়ে যাবে। হায়রে ভালোবাসা তুই খুব অদ্ভুত! না পারি তোকে ছাড়তে, না পারি তোকে ছাড়া বাঁচতে, জীবনে মরণে তুই আমায় ছেড়ে থাকলেও আমি পারব না তোকে ছেড়ে থাকতে।
যতই দিন যাচ্ছে বিয়ের তারিখও ততই ঘনিয়ে আসছে। বাসায় বিয়ের জন্য সবকিছুর আয়োজন হচ্ছে। আজ রাতে পালানোর প্রস্তুতি নিলো রেমা। রাত ১১টার দিকে রবিন এলো। জানালার গ্রিল কেটে কাপড়ের ব্যাগ নিচে ফেলল। ব্যাগটা পড়তেই একটা শব্দ হলো। শব্দটা শুনতে পেল আনান। দরজা খুলে পেছন থেকে রেমার রুমের কাছে গেল। দেখতে পেল রবিন দাঁড়িয়ে আর রেমা জানালা দিয়ে বের হচ্ছে। আনান চিৎকার করে উঠল। রবিন কী করবে ঠিক বুঝতে পারল না। ভয়ে তার গা কাঁপছিল। আনান খপ করে রবিনের হাত চেপে ধরে। রেগে আগুন হয়ে বলে, এই ছিল তোমার মনে? পিটিয়ে গায়ের চামড়া তুলে দিব।
বাবা তুমি ওকে কিছু বলো না, ওর কোন দোষ নেই। দোষ যা সব আমি করেছি, শাস্তি দিতে হলে আমাকে দাও। রেমা বলল।
তুমি যদি আর কখনো পালানোর চেষ্টা করো তাহলে এই বিষ খেয়ে আমি মরে তোমাকে পালানোর সুযোগ করে দেবো। তোমাকে আর পালিয়ে যেতে হবে না। তুমি তখন স্বাধীনভাবে যেতে পারবে।
না বাবা, তোমাকে তা করতে হবে না। আমি কথা দিচ্ছি।
আমি তো তোমার কথা মানছি না। আমি বিষ খেয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নিচ্ছি। তুমি থাকো তোমার ভালোবাসা নিয়ে।
আনান রবিনকে ছেড়ে দিয়ে পকেট থেকে বিষের শিশি বের করে। আঁতকে ওঠে রেমা। কেঁদে বলে, বাবা তুমি এমন কাজ করো না।
করতে আমাকে হবেই। আমার কথার যেখানে মূল্য নেই সেখানে আমার থেকে লাভ কী?
বাবা তুমি লাভ লোকসান পরে হিসাব করো আগে আমার কথা শোন?
যেতে চাও যাও, আমার মৃত্যু দেখে যাও।
বাবা আমি তোমার মৃত্যু দেখতে চাই না। তুমি যা বলবে আমি তাই শুনব।
সত্যি বলছো? ভেবে দেখো।
হ্যাঁ বাবা, আমি ভেবেই বলছি? তুমি বল আমায় কী করতে হবে? তার আগে আমার কাছে বিষের শিশি দাও।
না, তা হবে না। আমি যা বলি তা তুমি করো।
আনান চোখ বড় বড় করে রবিনের দিকে তাকায়। তারপর বলে, এ ছেলেকে তুমি অনেক ভালোবাসো। ওর আর আমার মাথার উপর হাত রেখে বলো— আমি তোমাকে যেখানে বিয়ে দিচ্ছি সেখানে বিয়ে করতে কোন অমত করবে না।
বাবা, এটুকু তোমার চাওয়া? হবে বাবা, তোমার চাওয়াই হবে?
মাথার উপর হাত রেখে দিব্বি কেটে বলতে হবে।
রবিনের মাথার উপর হাত রেখে বলতে হবে?
হ্যাঁ, ওর আর আমার মাথার উপর হাত রেখে বলতে হবে।
বাবা, তুমি জানো আমি তোমাকে ভালোবাসি না, ভালোবাসি শুধু ওকে। তাহলে ওর মাথার উপর হাত রাখি?
না, দুজনের মাথার উপর।
এমন সময় অহনা এলো। রবিন হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। রেমা দুজনের মাথার উপর হাত রাখল। অহনা অবাক হয়ে বলল, তুমি এসব কী করছো?
রেমা মাকে বলে, মা তুমি শুধু দেখে যাও। তারপর বাবার দিকে তাকিয়ে বলে, বাবা বলো কী বলতে হবে আমাকে?
আমি তোমাকে যেখানে বিয়ে দিচ্ছি সেখানে তোমাকে বিয়ে করতে হবে। এছাড়া অন্য কোথাও নয়।
বলছি বাবা তুমি শোনো, আমি আজ থেকে আমার ভালোবাসা এখানেই ভুলে গেলাম। বাবার কথামতো চলবো।
রবিনের দুচোখ বেয়ে শুধু অশ্রু ঝরছে। রেমার চোখে জল নেই। নিষ্ঠুর হয়ে বলে, বাবা তুমি খুশি তো? শেষ হয়ে গেল এখানে সব। বাবা আমাকে পাঁচ মিনিটের জন্য রবিনের সাথে কথা বলতে সময় দাও। আমি যাবো না। আমি যাবো না, ভরসা রাখো আমার উপর।
ঠিক আছে বলো, আমি এখানেই আছি।
রবিন, আজ থেকে আমাদের দুজনের এখানেই পথ চলা শেষ। আর দেখা হবে না কথা হবে না। আর দুজন এক সাথে হাত ধরে হাঁটতে পারব না। কিন্তু সব বন্ধ থাকলেও বন্ধ থাকবে না আমার হৃদয়ে তোমার জন্য ভালোবাসা। যেখানেই থাকি না কেন ভালোবাসা তোমার জন্য থাকবেই। রবিন রেমার হাত দুটি ধরে শুধু কেঁদেই যাচ্ছে। রেমা বলল, রবিন কিছু বলো। আমাকে তুমি কোন কথা বলবে না?
যেখানেই থাকো ভালো থাকো। আমাদের দুজনের অন্তরের কান্না থাকুক বহমান।
চেপে রাখব কান্না। সে কান্না কাউকে আমি দেখতে দিব না, বুঝতেও দিব না। অন্তরের সে কান্না শুধু অন্তরই বুঝবে, সে কান্না শুধু তোমার জন্যে।
হবে না দেখা আমাদের আর কোনদিন, এমনই নিয়তি আমাদের।
আমাকে যদি আমার বাবা মা ভালো রাখার জন্যে তোমার কাছ থেকে দূরে রাখতে পারে তাহলে তোমারও উচিৎ হবে আমাকে ছেড়ে ভালো থাকা।
হবে না তোমার হাত দুটি ধরা আর কোনদিন, কিন্তু আজ যে তোমার হাত দুটো ধরলাম তার স্পর্শের অনুভূতি আমার কাছে মৃত্যু পর্যন্ত থাকবে? হায়রে স্মৃতি, তুই মানুষকে বড় কাঁদাস! তোর স্মৃতির বেড়াজাল থেকে কেউ বের হতে পারে না।
স্মৃতির ধারণক্ষমতা মানুষকে আটকে রাখে মনের ভালোবাসার মাঝে। এ পৃথিবীতে তো তোমায় পাওয়া হলো না, ঐ পৃথিবীতে খুঁজে নিব তোমায়। তখন থাকবে না কোন বাধা।
ঠিক আছে তুমি যাও আমি যেখানে থাকব ভালো থকবো। তুমিও ভালো থেকো এ পুরনো স্মৃতি নিয়ে নয়, নতুন স্মৃতি নিয়ে।
চলি তাহলে। রেমা কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে নিজের রুমে যায়। রবিন দাঁড়িয়ে রইলো। আনানও সাথে সাথে বাসায় এলো।
রেমা কাঁদছে বিছানায় পড়ে। চোখের জলে বালিশ ভিজে যায়। মা এসে পাশে বসে। মাকে জড়িয়ে ধরে রেমা হু হু করে কাঁদছে। কেঁদে কেঁদে বলে, মা আমি তো তোমাদের সন্তান, আমাকে নিয়ে তো তোমাদের অনেক স্বপ্ন, সে স্বপ্ন পূরণে আমি বাধা হবো না। পূরণ করো তোমাদের ইচ্ছা।
তুই এভাবে কেঁদে কেঁদে বলছিস, তোর কান্না তো আমার বুকেও আগুন জ্বালিয়ে দেয়। আমার বুকের মধ্যে যে তোর জন্যে ক্ষত হয়ে যাচ্ছে।
ক্ষত তোমার মধ্যে কেন হবে মা? সে হলে তো আমার মধ্যে হবে। কিন্তু আজ আমার মধ্যেও কোন ক্ষত হবে না, কারণ বাবা আমার জন্যে সুখ ধরে এনেছে, তাতে আমি সুখী হবো।
ঠিক আছে তুই এখন ঘুমিয়ে পড়।
তুমি যাও আমি ঘুমিয়ে পড়ছি।
এ ঘরে ও ঘরে শুয়ে শুয়ে রেমা রবিনকে নিয়ে ভাবে— রবিন আমার পৃথিবী যে অন্ধকার হয়ে এসেছে, এখানে আমার জন্যে আর আলো জ্বলবে না। নিঘুর্ম শুয়ে থাকে রেমা।
অহনা সকালে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা বানিয়ে টেবিলে রাখল। আনান রেডি হয়ে নাস্তার টেবিলে এলো। রেমাকে ডাকে, কইরে রেমা কই তুই? অহনা, কই রেমা এলো না?
অহনা রেমার কাছে গিয়ে বলে, কিরে মা ঘুমিয়ে আছিস, ওঠ তোর বাবা তোর জন্যে নাস্তা নিয়ে বসে আছে।
রেমা কোন কথাই বলে না।
তোর বাবা কি তোকে ছাড়া নাস্তা করে?
বাবাকে খেতে বলো, আমার এখন খেতে ইচ্ছে করছে না।
তুমি নাস্তা করে নাও, ও শুয়ে আছে থাক। অহনা বলল আনানকে।
একরাশ বেদনা নিয়ে রবিনের সময় কাটে বাসায়। দেয়ালে টানানো মায়ের ছবির দিকে তাকিয়ে দুঃখ করে। কান্না আসে তার। মায়ের ছবির সঙ্গে কথা বলে— মা, আমার জন্যে কেউ থাকল না। থাকল শুধু কান্না, এ কান্নাই আমার এখন একমাত্র সঙ্গী। রেমা আমার কাছের মানুষ হয়েও আজ হয়ে গেল পর। ফিরে আসবে না রেমা, আর হবে না দেখা।
এভাবে কয়েকদিন কেটে যায়। তারপর কাজে গেল রবিন। আরে কাজ, তুই আমাকে ছাড়লেও আমি তোকে ছাড়ব কী করে? তবে আমি আর এখানে থাকব না। এখানে থাকলে মার আর রেমার কথা আমার মনে পড়বে? চলে যাবো এদের কাছ থেকে দূরে, অনেক দূরে।
সময় চলে তার নিজস্ব গতিতে। দিনের পরে রাত আসে আর রাতের পর দিন। রেমা তার রুম থেকে বের হয় না। মনে মনে বলে রেমা, ঘুম আমার জীবন থেকে চলে গেল। না ঘুমাতে না ঘুমাতে চোখের মধ্য থেকে অগুনের তাপ বের হচ্ছে।
এদিকে আনান ভীষণ ব্যস্ত বিয়ের ব্যাপারে। বিয়ের আয়োজন সব তার শেষ। মেয়ের মানসিক অবস্থার খোঁজ নিতে সে অহনাকে বলল, আচ্ছা রেমা তো আমার সাথে কোন কথাই বলে না!
একটু অভিমান করে আছে, আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে?
এদিকে রেমা দিনের পর দিন না খেয়ে বিছানা থেকে উঠতে পারছে না। অনেকটা রোগাটে হয়ে গেছে। অহনা শুধু দেখে যায় বাপ মেয়ের কাণ্ড। সইতে হবে তার তাই সব সয়ে যায়। অহনা মেয়ের কাছে ভাত নিয়ে বলে, মা তোকে আমি খাইয়ে দেই? কাল তোর বিয়ে। তুই না খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছিস। এদিকে কত লোকজন, আত্মীয়—স্বজন আসে রেমার কাছে। কারো সাথে কথা বলে না। অনা এসে রেমার পাশে বসে, রেমার দুচোখ দিয়ে শুধু অশ্রু ঝরে। অনা বলে, আমি ভাবতেও পারিনি তোদের জীবনটা এমন হবে! তুই পালিয়ে যা রবিনের কাছে, আমি তোকে সহযোগিতা করি।
রেমা মাথা নেড়ে না বলে।
পারবি তুই অন্য জায়গায় সুখী হতে? আমি যা বলছি তাই কর।
রেমা মাথা নেড়ে না বলে যাচ্ছে।
থাক তাহলে যন্ত্রণা নিয়ে, আমার সামনে কাঁদবি না।