উদ্বিগ্ন রেহানা হাসপাতালে বারান্দায় বসে আছে। হাসপাতালের এক কর্মী এসে জানালো ডাক্তার সাহেবের আসতে ঘন্টা দুয়েক দেরি হবে। রেহানা মনে মনে দীর্ঘ প্রতীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে নড়ে চড়ে বসে। অনেক আগের কথা। রেহানা এবং জসিম এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতো। আবাসিক সমস্যা প্রকট। মেস গুলোতে অনেক লোক একসঙ্গে গাদাগাদি করে থাকতে হয়। দুজনেই ভালো আবাসনের খোঁজ করছিল। ভাড়া নিতে গেলে বাড়ি ওয়ালাদের প্রথম কথা ব্যাচেলর ভাড়া দেওয়া হবে না। রেহানা এবং জসিম এই সমস্যা একটি সমাধান খুঁজছিল। এক সঙ্গে চাকরি সুবাদে সম্পর্কে একটা বিশ্বস্ততা গড়ে উঠেছিল। উদ্ভট পরিকল্পনার কথাটি জসিম প্রথম বলে| তারা স্বামী স্ত্রীর পরিচয়ে বাসা ভাড়া নেয়। ভালোই চলছিল, একদিন জসিম রেহানার উপর স্ত্রীর অধিকার প্রয়োগ করতে চায়। রেহানা বাধা দেয়। তার শর্ত, আগে অবশ্যই বিয়ে করতে হবে। জসিম এক মৌলভী সাহেবের কাছে নিয়ে গিয়ে রেহানাকে বিয়ে করে। রেহানা গর্ভবতী হয়ে পড়ে। উচ্ছ্বাস নিয়ে জসিমকে জানায়| একদিন সকালে উঠে রেহানা দেখে জসিম নাই। তাকে একা রেখে নিঃশব্দে পালিয়ে গেছে। সে কল্পনা করেনি এভাবে প্রতারিত হবে। গর্ভের সন্তান নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে। তার আত্মা এবং অস্তিত্বের অংশ এই সন্তান। তার রক্ত মাংসে তারই মধ্যে গড়ে উঠছে তিলে তিলে। কী করে হত্যা করবে তার আর এক অস্তিত্বকে। সে সিদ্ধান্ত নেয় যে করে হোক বাঁচিয়ে রাখবে সন্তানকে। শুরু হয় মরণ পণ লড়াই। কখনো অনুকূল কখনো প্রতিকূলতায় বুক দিয়ে আগলে রাখে ছেলেকে।
অনেকদিন বাড়িতে যাওয়া হয় না, রেহানা সিদ্ধান্ত নেয় বাড়িতে যাবার। যখন বাড়িতে যায় ছেলের বয়স তখন পাঁচ। লোকে জিজ্ঞেস করে, ছেলে কার? রেহানা বলে, আমার। সবাই বিস্ময় প্রকাশ করে। রেহানা বুঝতে পারে এভাবে হবে না। প্রশ্নবাণে জর্জরিত হয়ে অহেতুক বিপর্যস্ত হতে হবে। রেহেনা ছেলেটিকে পালক নেওয়ার এক বিশ্বাসযোগ্য গল্প তৈরি করে, সকলের বিস্ময় প্রশমিত হয়। রেহানার আত্মত্যাগের মহিমা কীর্তি হয়ে যায়। কোন এক ছেলের জন্য জীবনের সব সাধ আহ্লাদ বিসর্জন দিয়েছে মেয়েটা। সময় প্রবাহিত হয় আপন গতিতে। রেহেনা বুঝতে পারে জীবনের বাকি পথ পাড়ি দিতে হবে একাই। অনেক দুঃখের নিশি সুখের সকাল পেরিয়ে ফয়সালকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পার করায়। ফয়সাল তখন নাসরিনের প্রেমে নিমজ্জিত। নাসরিন কিছুতেই সুদর্শন ফয়সালকে হারাতে চায়না বলে পিতার সঙ্গে পরিচয় করায়। নাসরিনের পিতা বৈষয়িক মানুষ। ফয়সালের সঙ্গে আলাপচারিতায় তার পিতৃ পরিচয়ের বিষয়ে বলতে গিয়ে জট বেঁধে যায়। ফয়সাল রেহানার কাছে এসে জানতে চায় তার জন্ম রহস্য, পিতৃ পরিচয়। বাক্য বিনিময়ের এক পর্যায়ে রেহানা বলে দেয়, সেই তার প্রকৃত মা। ফয়সাল স্তব্ধ হয়ে যায়। এতদিন যাকে সে পালনকারী মা বলে জেনে এসেছে সেই তার আসল মা। দ্বিধান্বিত ফয়সাল আদ্যপন্ত জেনে আরো নিশ্চিত হতে চায়। ছেলের মনে সন্দেহের মেঘ জমে আছে। মনের আকাশ থেকে সেই মেঘ পুরোপুরি মুছে দিতে চায়। রেহানা রাজি হয় ডিএনএ টেস্ট করাতে। আজ তাই অপেক্ষা হাসপাতালের বারান্দায়। ডাক্তারের মুখ থেকে কথাটা শুনে নিশ্চিত হতে চায়। ঘটনার বিস্তারিত শুনে ডাক্তার সাহেব হয়তো আবেগাপ্লুত হয়েছেন। মা ছেলে দুজনকে ডাকলেন চেম্বারের ভিতরে। ফয়সালের দিকে তাকিয়ে গভীর কণ্ঠে বললেন, ইনিই তোমার গর্ভধারিনী মা। অস্ফুট কন্ঠে ফয়সালের মুখ দিয়ে একটি শব্দ বের হলো, মা। শব্দটি রেহানার পাঁজর ভেদ করে বুকের মধ্যে ঢুকে গেল। মা শব্দের ব্যঞ্জনা সুর ও মাধুর্য নিয়ে এভাবে আগে কখনো ধ্বনিত হয়নি তার কাছে।
