”স্বার্থের সিঁড়ি”

author
0 minutes, 18 seconds Read

ভালোবাসা পরিণত হয় কত দিনে। কেউ বলে বছর মাসে, কেউ বলে হবার হলে দু-একদিনে। অনিক ভাবনার ভালোবাসার বয়স পেরিয়েছে কয়েক বছর। একদিন ভাবনা বলে, এভাবে আর মাঠ ঘাটে তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাই না। অনিক বলে, বেশতো আমি তোমাকে বউ করে নিতে চাই। ভাবনা লাজুক হাসিতে বলে, তুমি আমাকে বউ করতে চাও? হ্যাঁ চাই। এ কথায় আশ্চর্য হওয়ার কী আছে! কেন, তুমি কি বিয়ে করতে চাও না? হ্যাঁ আমি বিয়ে করতে চাই। আমি আমার পরিবারের সঙ্গে আমাদের বিয়ে নিয়ে কথা বলব। অনিকের চিন্তিত অভিব্যক্তি, তোমার পরিবার কি এমন বেকার ছেলের সঙ্গে তোমার বিয়ে দিতে চাইবে। আগে একটা কাজকর্ম দরকার। দেখি কী করা যায়।
অনিক মায়ের সঙ্গে তার বিয়ের আলাপ করে। মা হোসনেরা বলেন, বিয়ে করবি ঠিক আছে। বেকার ছেলে, বউকে খাওয়াবি কি? অনিকের কাছে এ প্রশ্নের উত্তর নাই। কিন্তু মাথায় আসে পরিত্রাণ লাভের প্রচলিত ধারণা। মা তোমরা আমাকে বিদেশে পাঠানোর চেষ্টা করো। হোসনেরা‌ ছেলের কথা শুনে বলেন, বিদেশ যাওয়া কী মুখের কথা! অনেক টাকার দরকার। মা সে ব্যবস্থাই করো। সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করব কিন্তু তাতে কতটুকু হবে। এক কাজ কর, আমরাও কিছু ব্যবস্থা করি আর যাকে বিয়ে করবি তাদের কাছ থেকে কোন সহযোগিতা পাওয়া যায় কিনা দেখ। ঠিক আছে মা আমি এ ব্যাপারে আলাপ করব।
অনিক ভাবনার সঙ্গে দেখা করে।‌ ভাবনা, কিছু মনে করো না। আমি কথাটা বলতে চাইনি তারপর না বলেও পারছি না। এই বদ্ধতা থেকে মুক্তি পেতে বিদেশে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমার বাবা-মা বাহিরে যাওয়ার টাকার ব্যবস্থা করবে। সেটা যদি যথেষ্ট না হয় তোমাদের পক্ষ থেকে কিছু করা সম্ভব কিনা? অনিকের কোথায় অপ্রস্তুত ভাবনা। তুমি তো জানো আমাদের অবস্থা ভালো না। তারপরও তুমি বলছো যখন আমি কথা বলব মায়ের সঙ্গে। তুমি তো জানো আমার বাবা নাই। মা কষ্ট করে আমাকে মানুষ করছে। তার মধ্যেই মা যদি কিছু পারে দিতে। ভাবনা মায়ের কাছে গিয়ে বিষন্ন মনে বসে। কিরে মা কী হয়েছে এভাবে বসে আছিস কেন? দেলোয়ারা জিজ্ঞেস করেন মেয়েকে। সংকোচ ঝেড়ে ফেলে ভাবনা বলে, মা একটা কথা বলতে চাই। বল মা কি বলবি? মা অনিক বিয়ের কথা বলে। এতো ভালো কথা। তবে মা ও বাহিরে যাবে কিছু টাকা পয়সা চায়। মা তুই তো জানিস আমাদের তেমন কিছু নাই এক খন্ড ধানের জমি আছে ওইটা দিয়েই মা মেয়ে চলি। দেলোয়ারা মেয়ের বিষন্ন মুখের দিকে তাকিয়ে নিজেও বিষন্ন হন। মন খারাপ করিস না মা। ওই জমিটা বিক্রি করে দেখি কত টাকা আসে। তোর বিয়ে হলে আমি তো একা, আমার কোন ভাবে দিন চলে যাবে। দেলোয়ারা জমি বিক্রি করেন। মেয়ের বিয়েতে সেই টাকা জামাইয়ের হাতে তুলে দেন। জামাইয়ের হাত ধরে বলেন, বাবা দুনিয়াতে আমার এই এক মেয়ে ছাড়া আর কেউ নাই। আমার মেয়ে সুখে থাকলে তাতে আমি সুখী। তোমার কাছে আমার একটা আবদার তুমি আমার মেয়েকে সুখে রেখো। অনিক শাশুড়ির হাত ধরে বলে, আমি কথা দিলাম সর্বান্তকরণে চেষ্টা করব আপনার মেয়েকে সুখে রাখার।
অনিক আর ভাবনার বিয়ে হয়। অনিকদের একান্নবর্তী পরিবার। ভাবনা শ্বশুরবাড়ি হাসি খুশিতে প্রাণবন্ত করে রাখতে চেষ্টা করে। শাশুড়ি জা কাউকে কোন কাজ করতে দেয় না। নিজেই সব সামলাতে চেষ্টা করে। অনিকের বড় ভাইয়ের বউ মৌমিতার যথেষ্ট প্রভাব সংসারে। জা কাজ করতে গেলে ভাবনা দৌড়ে আসে। আমি থাকতে আপনি কাজ করবেন কেন? মৌমিতাকে উঠিয়ে দিয়ে কাজ সেরে ফেলে। শাশুড়ি আর জা খুবই খুশি ভাবনার উপর।
অনিক ভাবনাকে বলে, কেমন মায়াবী ভালবাসায় বেঁধে ফেললে আমাকে। বিদেশে যাব ঠিকই, মনটা পড়ে থাকবে তোমার জন্য। তোমাকে ছেড়ে যেতেও ইচ্ছা করছে না। ভাবনা অনিকের মুখ টিপে ধরে। না তুমি বাহিরে যাও। আমাদের সবার সুখ শান্তির জন্যই তো তুমি যাচ্ছ। বাইরে আমি কাজে থাকি বা যেখানেই থাকি তোমার কথাই শুধু মনে পড়বে। ভাবনা বলে, আমারও।
অনিক বিদেশে যায়। ভাবনার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করে। পরিবারের সবার সঙ্গেও কথা বলে। অনিক বিদেশ থেকে টাকা পাঠায়। সংসারের খবরদারি মৌমিতার হাতে। ব্যাংকে টাকা রাখা উঠানো সব মৌমিতা করে। টাকার মালিক মৌমিতা। আস্তে আস্তে ভাবনার সঙ্গে অনিকের যোগাযোগ কমে আসে। ভাবনা ভাবে, হয়তো কাজের ব্যস্ততা জন্য নিয়মিত যোগাযোগ করতে পারেনা। কিন্তু দেখে পরিবারের যখন যার সাথে দরকার তার সঙ্গে ঠিকই কথা বলে। শুধু ভাবনার সঙ্গে কথা বলা সীমিত হয়েছে। ভাবনা নিজেই স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ করে। বলে, তোমার কি শরীর খারাপ? কিংবা কোন কারণে আমার প্রতি রেগে আছো? অনিক উত্তর দেয়, না কারো প্রতি রাগ নাই। তুমি এরকম কাটা কাটা উত্তর দিচ্ছ কেন? অনিকের সংক্ষিপ্ত উত্তর, আমি এখন ব্যস্ত আছি।
একদিন মৌমিতা হাতে একটা চিঠি নিয়ে ভাবনাকে বলে, তোমাকে একটা কথা বলতে চাই। বলেন ভাবি। মৌমিতা যে কথা বলে তাতে ভাবনার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে যায়। তুমি এ বাড়িতে থাকলে অনিক আর বাড়ি আসবে না। ভাবনার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। এই কথা আমার স্বামী আপনাকে বলছে? আমি এ বাড়ি থাকলে কেন সে আসবো না? সেটা অনিকেই ভালো জানে। তুমি একটা কাজ করতে পারো তুমি বাপের বাড়ি চলে যাও। চূড়ান্ত কথাটা বলতেও মৌমিতার মুখে আটকায় না। এখনো বাচ্চাকাচ্চা হয় নাই। তুমি অন্য জায়গায় বিয়ে-শাদী করলে তোমার পিছুটান থাকবে না। ভাবি আপনি এসব কি বলছেন? আমি যা বলছি এটা আমার কথা না, অনিকের কথা। নারী হয়ে আরেক নারীকে চরম দুর্ভোগের কথা এভাবে বলতে পারেন? তুমি আমাকে দোষারোপ করছো কেন? এটা অনিকের কথা, আমাকে বলতে বলল তাই আমি তোমাকে বললাম। ভাবনা দৌড়ে শাশুড়ি কাছে যায়। আম্মা শুনেন, মৌমিতা আপা কী সর্বনাশা কথা বলছে। শাশুড়ির নির্লিপ্ত কথা, আমি কী বলবো বলো! অনিক নাকি বড় বৌমাকে এই কথা বলতে বলছে।
অনিকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চেষ্টা করে ভাবনা তাতে কোন সারা শব্দ পায় না। ভাবনা প্রতিবাদী হয়। আমি কিছুতেই স্বামীর বাড়ি ছেড়ে যাব না। আমার স্বামী দেশে আসবে তার মুখ থেকে আমি শুনতে চাই। মৌমিতা বলে, ঠিক আছে অনিক দেশে এসেই বলবে তোমাকে। অনিক দেশে আসে। ভাবনাকে সরাসরি বলে, তুমি এই বাড়ি থেকে চলে যাও। এখন আমার ইচ্ছা আমি আমেরিকা যাব। সিলভিয়া আমাকে ভালবাসে আমিও সিলভিয়াকে ভালোবাসি। সিলভিয়াকে দিয়ে আমি সম্ভাবনার দেশে যেতে পারবো। তুমি যদি বাড়ি থেকে না যাও আমার মরা মুখ দেখবা। ভাবনা দৌড়ে মৌমিতার পা জড়িয়ে ধরে। ভাবি আপনি অনিককে বুঝান। আমি কী বুঝাবো? মৌমিতার চটাং চটাং কথা। ওর জীবনের উন্নতিতে বাধা হয়ে দাঁড়াবে কেন? শাশুড়ির কাছে দৌড়ে যায়। আম্মা এই সর্বনাশ ঠেকান। আপনি আপনার ছেলেকে বুঝেন। আমি কিছুতেই অনিককে ছেড়ে যাবো না। আমি কি আমার ছেলের ভালোর না তাকিয়ে তোমার দিকে তাকাবো? মৌমিতা আর হোসনারার এক কথা, তুমি এই বাড়ি থেকে চলে যাও অনিক যে সিদ্ধান্ত নিছে সে সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। কাকুতি মিনতি করে কোন কাজ হয় না। স্বামীর পা জড়িয়ে ধরে। অনিক তুমি আমাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলে তুমি আমাকে ছেড়ে দিতে পারো না। আমি কী নিয়ে বাঁচবো! অনিকের উত্তর, আমি তো বললাম আমি সিলভিয়াকে ভালোবাসি। ওকে পেতে হলে তোমাকে হারাতে হবে। আমার স্বপ্ন আমি ওই বড় রাষ্ট্রের সিটিজেন হবো। সে স্বপ্নের সিঁড়ি সিলভিয়া। ভাবনা দেখে তার চোখের জল কাকুতি মিনতি কারো মন গলাতে পারে না। সে এক কাপড়ে পিত্রালয়ে চলে যায়। চিৎকার করে মায়ের বুকে পড়ে। মা আমার সব শেষ। দেলোয়ারা বলেন, এটা কি মগের মুল্লুক। একজনকে ছেড়ে দিবে আর অমনি হয়ে যাবে সব! মামলা করব। না মা আমি মামলা করব না। বিচার থাকলে তো বিচার চাইবো। কোথায় কোন বিচার নাই। যাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছি প্রতিদানে তার কাছ থেকে কী পেলাম। আমাদের কোন সহায় সম্পদ ছিল না, শেষ সম্বল একটুকু জমি ছিল তাও বিক্রি করে টাকা ওর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। সেইটাই যখন বুঝলো না মামলা করে কি হবে! এখন যেটুকু আছে আদালতের বারান্দায় ঘুরে সেটুকু নিঃশেষ হয়ে যাবে। আমার কপালে যা লেখা আছে তাই হবে। দেলোয়ারা বলেন, কাউকে কাঁদিয়ে কেউ সুখী হয় না। দেখিস ও কোনদিন সুখী হবে না।
ভাবনা অনিকের বাড়ি থেকে এসেছে বছর দুই হয়ে গেল। অনিকের সঙ্গে যোগাযোগ নাই। অনিকের সঙ্গে সিলভিয়ায়ার সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায় লুব্ধ আচরণের কারণে। বড় রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব আর নেওয়া হয় না। অনিক দ্বিতীয় বিয়ে করে। সেই বউ কয়েক মাস থাকার পর অনিকের পনেরো লক্ষ টাকা আর গহনা নিয়ে পালিয়ে যায়। অনিকের সব আশা ভরসা নিঃশেষ হয়ে যায়। তার মনে অনুশোচনা জাগে। যে এত ভালবাসলো তাকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার মর্মপীড়ায় ভোগে। তাকে স্বামীর অধিকার থেকে বঞ্চিত করার অনুতাপে জর্জরিত হয়। যে আশায় তাকে ছেড়েছিল সে আশা অপূর্ণ রয়ে গেল। দ্বিতীয়বার বিয়ে করেও প্রতারিত হলো।‌ ভাবনার নিঃশব্দ নিঃশ্বাসের অভিশাপ লাগেছে। অনিক মনে মনে বলে, আজ তোমাকে ভীষণ মনে পড়ছে। কাছে পেতে ইচ্ছে করছে। যে আমার ছিল অনেক আপন সে এখন অনেক পর। তাকে আর চাইলেও পাওয়া যাবে না। ভাবনা তুমি যেখানে থাকো সুখে থাকো। ভালো থাকো এই কামনা করি। পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিও।
ভাবনার বিয়ের কথা বললে না বলে। কোনমতেই তাকে বিয়েতে রাজি করা যায় না। পরে মায়ের জোরাজুরিতে বিয়ে করে। ভাবনা অদৃষ্টের বিপত্তি থেকে মুক্তি পায়। সেখানে গড়ে তোলে এক সুখের জীবন।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *