
নাতনিরে নিয়ে ভাবেন দাদি ফুলভানু। অল্প বয়সে নাতনি তাঁর বিধবা হয়েছে। কীভাবে একা একা জীবন পার করবে, সেই চিন্তাই তাঁকে কুরে কুরে খাচ্ছে। ভবিষ্যতের কথাও তো ভাবতে হয়! এইভাবে তো আর চলে না। দেখেশুনে একটা বিয়ে দিয়ে দিই। দাদির মুখে কাঁপা কাঁপা সুর।
রেনু ধীরে বলে, দাদি, আমি আর বিয়ে করতে চাই না। আমার সন্তান আছে, তাকেই নিয়ে আমি থাকতে চাই। দাদি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, এই বিয়ের ভাবনা তো শুধু তোকে নিয়েই নয় রে, তোর সন্তানের কথাও ভাবছি। তাকে মানুষ করতে হবে না? জীবনের পথ এত সহজ নয়। তোর অল্প বয়স, বাস্তব বুঝিস না। বাস্তব জীবন অনেক কঠিন। দাদির কণ্ঠ আরও ভারী হয়ে আসে, তোর ছোটবেলায় তোর মা-বাপ মারা গেছে। এখন শুধু আমি আছি। আমারও তো বয়স হয়েছে। আমি না থাকলে কে দেখবে তোকে?
রেনুর বিয়ে হলো লতিফের সঙ্গে। সে জানত রেনুর একটি ছেলে সন্তান আছে। কিন্তু কোনো আপত্তি নেই তার। বরং সে যেন এক অলিখিত অঙ্গীকারেই এসেছিল, সে বাহারকে ভালোবাসে নিজের সন্তানের মতোই। বাহার তাকে “বাবা” বলে ডাকে, আর লতিফ সেই ডাকে আদরভরা কন্ঠে সাড়া দেয়। রেনুর বুক ভরে যায়, চোখে জল আসে প্রশান্তির। তুমি আমার বাহারকে আদর করো, দেখে আমার মন ভরে যায়, বলে রেনু। লতিফ হেসে বলে, আদর করবো না কেন! ও তো আমার ছেলে। আমারও তো এরকম একটা ছেলে রেখে মৃত্যু হতে পারত! কোন কিছু সহজভাবে মানলেই সহজ। কঠিন ভাবে ভাবলে কঠিন।
রেনু এবার এক কন্যাসন্তানের মা হলো। লতিফের মুখে তৃপ্তির হাসি, দুই সন্তান, এক ছেলে আর এক মেয়ে যেন পূর্ণ হলো আমার সংসার। স্বামী-স্ত্রী দু’জনে নতুন অতিথিকে ঘিরে খুশিতে ভরে ওঠে। ছোট্ট মেয়েটিকে ঘিরে ভালোবাসার এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। বাহারও ছোট বোনকে স্নেহে ভরিয়ে দেয়। দু’ভাইবোন ধীরে ধীরে একসাথে বেড়ে উঠতে থাকে।
তবে সময়ের পরিক্রমায় ধরা পড়ে, ছোট মেয়েটি লোপা, স্বাভাবিক নয়। তার চোখে যেন নিরব আকুলতা, কথা না বলতে পারা। সে প্রতিবন্ধী। কিন্তু তার ভালোবাসার ভাষাটা স্পষ্ট, ভাই বাহার যখন খেতে বসে, লোপা আঙুল তুলে দেখায়, ভাইকে কাছে ডাকতে চায়। তার হাতে খাবে, ভাইয়ের হাতেই স্বস্তি। বাহারও বোনকে মুখে তুলে খাওয়ায়। এই দৃশ্য ছিল এক নিঃশব্দ ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি।

রেনুর দুঃখ যেন আর পিছু ছাড়ে না। অল্প বয়সেই দু’বার বিধবা হওয়া এক নারী, দুই সন্তানের ভার কাঁধে নিয়ে কীভাবে পার করবে জীবনের দীর্ঘ পথ? তার উপর ছোট মেয়ে লোপা, শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী। তবু রেনু থেমে যান না। লতিফ রেখে যাওয়া সম্পদের দেখভাল করে সংসার চালায়। মনের ভিতর ঢেউ খেললেও, বাইরে থেকে যেন স্থির এক নারী, অবিচল।
বাহার, কলেজ থেকে ফিরে এলেই লোপা ভাইয়ের গলা জড়িয়ে ধরে। বাহার বোনকে কোলে তুলে নেয়, আদরে ভরিয়ে দেয়। তাকে গোসল করায়, খাওয়ায়, ঘুম পাড়ায়, ভাইয়ের মমতায় যেন মা-ও হার মানে। রেনু বলে, বাবা, তুই পড়ালেখা কর, লোপারে আমি দেখবো। বাহার মাথা নেড়ে উত্তর দেয়, মা, তুমি দেখো না? ও আমাকে ছাড়া কিছুই বুঝে না। রেনুর চোখে মুখে প্রশান্তিতে ভরা। সে বলে, যাক বাবা, তোদের ভাইবোনের বন্ধন যেন এভাবেই থাকে। মা থাকে মানি ভাই বোনের সম্পর্ক কি পর? এ এমনি বন্ধন যা কখনোই পর হয় না। রেনু ছেলে বাহারের মাথা ধরে প্রশান্তির হাসি দেয়।
বাহার বড় হয়েছে। রেনু ভাবে ছেলের কথা, এবার ওর বিয়ের কথা ভাবা দরকার। বাহার একদিন মায়ের কাছে এসে বলল, মা, আমি নাজিয়াকে বিয়ে করতে চাই। রেনু ছেলের সিদ্ধান্তে মত দেয়। নাজিয়া আসলো রেনুর পুত্রবধূ হয়ে। যাক এবার আমি শান্তি। বউয়ের হাতে সংসার ছেড়ে দিতে পারব। রেনু নিজেকে সান্ত্বনা দেয়, যাক সংসারটা এখন নাজিয়া সামলাবে। নাজিয়ারে কোথায় কী আছে সব দেখায়। মা সংসারটা তোমার তুমি কিভাবে পরিচালনা করবা এটা তোমার বিষয়।
নাজিয়া প্রশ্ন করে, মা, আপনার কোনো গয়নাগাটি নেই? রেনু মাথা নিচু করে বলে, মা, তেমন কিছু নেই। শুধু দুই জোড়া বালা আছে, এইটা লোপার জন্য। নাজিয়া একটু বিরক্তির সুরে বলে, ও তো প্রতিবন্ধী মা, বালা দিয়ে ওর কী হবে? রেনুর এই কথায় চোখে অশ্রু জমে উঠে। মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভাবলেই মন ভেঙে যায়। সে মৃদু গলায় বলে, শোনো বৌমা, তোমার যদি বালা লাগে, আমি বানিয়ে দেব। কিন্তু এইটা লোপার জন্য রাখা ওরই থাক। নাজিয়া হাসিমুখে বলে, মা, দেখি তো কেমন বালা জোড়া। রেনু ধীরে ধীরে কাঠের আলমারি খুলে ধূলি জমা বাক্স থেকে বের করে আনে দুই জোড়া পুরনো সোনালী বালা। নাজিয়ার হাতে তুলে দেয়।
নাজিয়া বালা জোড়া হাতে নিয়ে কী যেন ভাবে। তারপর একটুও না ভেবে বালা নিজের হাতে পড়ে ফেলে। মা, দেখেন না? কত সুন্দর লাগছে আমার হাতে! আমার হাতেই রাখি, আপনি পরে লোপার জন্য বানিয়ে দেবেন। রেনুর মুখের হাসিটা এক মুহূর্তে নিস্তেজ হয়ে যায়। বুকটা হাহাকার করে ওঠে। কিন্তু চোখ দুটো থেমে যায় সেই বালার দিকে, যা তার মেয়ের জন্য রাখা ছিল ভালোবাসা আর প্রতিশ্রুতির প্রতীক হয়ে।
বাহার বাইরে থেকে ফিরতেই লোপা ধীরে ধীরে তার পাশে এসে বসে। চোখে মুগ্ধতা, মুখে চাপা আনন্দ। গলা জড়িয়ে ধরে ভাইকে, নরম গলায় ফিসফিসিয়ে বলে, ভাইয়া তুমি আমাকে খাইয়ে দাও না। বাহার হাসে, ঠিক তখনই পেছন থেকে কাটা ছেঁড়ার মতো শোনায় নাজিয়ার কণ্ঠ, গলা ছাড়ো লোপা! ভাই কেন তোমাকে খাওয়াবে? নিজে খেতে শেখো। সবকিছুতেই ভাই ভাই করা ঠিক না। লোপার মুখ শুকিয়ে আসে, চোখ মুছে যায়। একটা শিশুর মনের ভেতর অভিমানের ছায়া নামে। বাহার আস্তে আস্তে বলে, নাজিয়া, ওকে কিছু বলো না। ও তো আমাকে ছাড়া কিছু বোঝে না। আমি খাওয়াব ওকে। কিছু কথা থাকে নিরবতা দিয়ে বলার বাহার হয়তো তা-ই বোঝাতে চেয়েছিল। একটু দূরে দাঁড়ানো নাজিয়া বিরক্ত হয়ে বলে, ভাইয়ের গলায় ঝুলে থাকে কেন এতো? তুমি ওকে অত আহ্লাদ করে ফেলেছো। এখন সবকিছুতেই তোমার ওপর নির্ভর করে।
দিন কাটে, আলো কমে আসে। ছোট ছোট মুহূর্তের অভিমান জমে বড় হয়। ভাই-বোনের সেই আগের মতো হাসি-ঠাট্টা আর খুঁজে পাওয়া যায় না। অজান্তেই একটা অদৃশ্য দূরত্ব গড়ে ওঠে। লোপা ভাইয়ের জন্য কান্না করে। তা দেখে রেনু নরম গলায় বলল, বৌমা, একটু দেখো তো, মেয়েটার কী অবস্থা। ও যে ভাই ছাড়া কিছু বোঝে না। তুমি ওকে ওর ভাইয়ের কাছে যেতেই দিচ্ছো না!

নাজিয়া হালকা বিরক্তি নিয়ে জবাব দিল, মা, বাহার ঘরে এলে আমি তো একটু সময় চাই, মন চায় দুটো কথা বলি। কিন্তু তাতো পারি না। যেন সবটাই দখল করে রাখে। লোপা সবসময় ভাই ভাই করে। সেটা আর সহ্য হয় না! রেনু একটুখানি নীরব হলো। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ঠিক আছে বৌমা, আমি বলব ওকে আর যেন ভাইয়ের কাছে না যায়।
ঘরের কোণে সন্ধ্যার আবছা আলো ছড়িয়ে। চুপচাপ বসে আছে রেনু, হালকা কাশি দিয়ে উঠে দাঁড়াতেই নাজিয়া সামনে আসে। নাজিয়া ধীরে বলল, মা, একটা কথা বলতে চাই। রেনু কিছুটা ক্লান্ত স্বরে উত্তর দিলেন, বল বউমা, কী বলতে চাও?
নাজিয়া একটু ইতস্তত করে বলল, এই যে আপনার ছেলে আমি আসলে ওর ভালো ভাবী। তা না হলে বলতাম না। রেনু চোখ তুলে তাকিয়ে বললেন, ঠিক আছে, সরাসরি বলো, কী ভাবছো? নাজিয়া নিশ্বাস ফেলে বলল, মা, আপনি তো দুই সন্তানের মা। কিন্তু এক সন্তান তো আপনি জানেন সে প্রতিবন্ধী। এ কথার মাঝখানেই রেনুর মুখটা কঠিন হয়ে উঠল। বউমা! তুমি আমার মেয়েরে বারবার ‘প্রতিবন্ধী, প্রতিবন্ধী’ বলো, আমার বুকটা কেমন ঝাঁকি মেরে ওঠে। জানো তো, একটা মা হিসেবে এই শব্দটাই আমার হৃদয়কে ফুটো করে দেয়। আর লোপা তো আমারই রক্তমাংসের সন্তান। নাজিয়া চুপ হয়ে যায়। রেনুর মুখে তখন এক তীব্র বেদনার ছাপ, চোখে অশ্রু। তুমি ওকে দুর্বল ভাবো, অথচ ও তো শুধু একটু ভালোবাসা আর যত্ন চায়। সেইটুকুই তো বড় সম্পদ। ঘরের বাতাস যেন থমকে গিয়েছিল। নাজিয়া একটু বিরক্ত স্বরে বলল, ঠিক আছে, বলব না। কিন্তু একটা কথা বলতে চাই। আপনার যে সম্পত্তি আছে, সবকিছু বাহারের নামে করে দেন? আপনার তো দুইটা সন্তান। আপনের মেয়ে লোপা তো এসব পরিচালনা করতে পারবে না। রেনুর কণ্ঠে কঠোরতা: বউমা, যার যা প্রাপ্য তা আমার মনে আছে। আমি তো কাউকে কম দিচ্ছি না। সম্পত্তি তো আমার দুই সন্তানেরই। এই কথার মাঝখানে বাহার বিস্ময়-চোখে তাকিয়ে থাকে নাজিয়ার দিকে। নাজিয়া তুমি এসব কী বলছ মাকে? তুমি চাও মা আমাকেই সব দিয়ে দিক? নাজিয়া কিছু না বলে বাহারের হাত চেপে ধরে বলে, চলো, কথা আছে। দুজনে ঘরের এক কোণায় সরে যায়। সেখানে নাজিয়া আস্তে ফিসফিস করে বলে, তুমি জানো তো, আমি যা বলছি, সব তোমার ভালোর জন্যই। লতিফ তোমার জন্মদাতা নন। এই সম্পত্তির আসল উত্তরাধিকারী লোপাই। এখন যদি তোমার মা ওর নামে সব করে ফেলে, তোমার কী থাকবে? বাহার কাঁপা গলায় বলে, নাজিয়া আমি তোমার সঙ্গে এটা করতে পারবো না। এটা ওর প্রাপ্য। মাকে দিয়ে জোর করে কিছু আদায় করাও অন্যায়।
রেনু সব বুঝে গেছে। সময় এসেছে চলে যাওয়ার। ছেলেকে আর বউকে ডেকে রেনু বলে, আমার চোখ বন্ধ হয়ে আসে। মনে হয় আমার ওপার থেকে ডাকে এসেছে। চোখে পানি। আমি জানি না আর কতটা সময় আছি। কিন্তু আমি চলে গেলে, তোমাদের কাছে একটা অনুরোধ, আমার মেয়েটাকে দেখে রেখো। ও যেন কোনোদিন কষ্ট না পায়। রেনুর শরীর নিথর, সে চলে যায় চিরতরে।
ঘরের কোণার একটি অন্ধকার ঘরে নিঃশব্দে পড়ে আছে লোপা। ক্ষুধা, অবহেলার জ্বালা নিয়ে। একদিন, শেষ শক্তিটুকু সঞ্চয় করে দরজার দিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে ডাকে লোপা। কিন্তু দরজা খোলে না। বাহারের মুখটাও আর দেখা হয় না। হৃদয়ে শুধুই প্রশ্ন, যার নামে সম্পত্তি, যার ঘর, সে-ই কেন খাবারের জন্য ভিখারি? চরম অভুক্ত অবস্থায় চুপিচুপি রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যায়। খাবার চুরি নয়, বরং প্রাণ বাঁচানোর এক মরিয়া চেষ্টা। নাজিয়া দেখে ফেলে। চোখ রাঙিয়ে গর্জন, তুই ভাত খাবি? মাটি খা! এক ধাক্কা দেয় লোপা মাটিতে পড়ে যায়। ক্ষুধা, কষ্ট, লাঞ্ছনার এতটা ভার বয়ে ওর শরীর আর পেরে ওঠে না। পানি… পানি…অশ্রু চোখে ফিসফিস করে বলে লোপা।
নাজিয়া এক গ্লাস পানি এনে মুখে ছুঁড়ে দেয়। পানি মাটিতে পড়ে গড়িয়ে যায়। লোপা সেই মাটির পানি চেটেচেটে খায়, এ যেন তার জীবনের শেষ চাওয়া। এরপর আর কোনো সাড়া নেই। দু’চোখ খোলা থাকে। লোপা মারা যায়… নিঃশব্দে। রুমের এক কোণে পড়ে থাকে তার নিথর দেহ। সম্পত্তি থাকলেই ভোগ করা যায় না। যেমন পারেনি লোপা।
কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আছে বাহার। আকাশ যেন থম ধরে আছে, বাতাসেও নেই কোনো চলাচল। চোখের কোণে অশ্রু নয়, অশ্রু নদী। বাহার কবরের দিকে তাকিয়ে বলে, বোন, তুই চলে গেলি পৃথিবী ছেড়ে। আমি তোর খোঁজ খবর রাখি নেই।
নাজিয়া কিছুটা হিম গলায় বলে, লোপা বারবার ডাকছিল ভাই ভাই করে। সে তোমাকে দেখতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি তোমাকে বলিনি। বাহার থমকে যায়। চোখ রাঙিয়ে বলে, আমার বোন আমাকে দেখতে চাইছিল, তুমি জানতেও দিলে না? এখন বলছো? কেন বলছো? কান্নায় গলা ভেঙে যায় বাহারের, মাটিতে বসে পড়ে। মাথা কবরের দিকে ঝুঁকিয়ে শুধুই বলে বোন ক্ষমা করে দে। যার নামে সম্পত্তি, সে না খেয়ে মরল। আর যার কিছুই ছিল না, সে রাজত্ব করল… হায়রে সম্পত্তি… হায়রে মানুষ!
