
পাঁচ ভাই বোন আর বাবা-মা নিয়ে আলেয়াদের সংসার। বড় দুই ভাই তারপর আলেয়া। এরপর এক ভাই এক বোন। আলেয়ার বাবা সীমিত আয় দিয়ে দক্ষ হাতে সংসার চালাতেন। প্রাচুর্য না থাকলেও সংসারে অভাব ছিল না। এক্ষেত্রে আলেয়ার মায়েরও ছিল নীরব আর দৃঢ় ভূমিকা। সংসার সুখের হয় রমনীর গুনে। মাকে দেখলে কথাটা বারবার মনে পড়ে আলেয়ার। হঠাৎ একদিন সব এলোমেলো হয়ে যায়। যে দিন বাবার মৃতদেহটা অফিস থেকে লাশবাহী গাড়ি করে বাসায় নিয়ে আসা হলো। বাবার শেষ কথা ছিল, বুকে ব্যথা। তারপর কাউকে কোন কিছু করার সুযোগ না দিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। ডাক্তার এসে হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন। একজন মানুষের আকস্মিক অনুপস্থিতি সব সবকিছু ওলট পালট করে দেয়। সময়ের সংঘাত একটা জমাট বদ্ধ সংসারে বাঁধন ধীরে ধীরে আলগা হতে শুরু করে।
বড় দুই ভাই বিয়ে করার পর সাংসারিক সংকট ক্রমশ ঘনীভূত হতে থাকে। মা শত চেষ্টা করে রমণীর গুণ দিয়ে সাংসারিক সংকট ঠেকাতে পারছিলেন না। ভাবিদের প্ররোচনার মায়ের সব অনুরোধ উপেক্ষা করে দুই ভাই আলাদা হয়ে যায়। ভাইয়েরা সামান্য আর্থিক সহায়তায় করতো। তাই নিয়ে সংসার ঠিক রাখার কঠিন যুদ্ধে নেমে পড়ে আলেয়ার মা। ভাইদের আর্থিক সহায়তা ক্রমশ সংকুচিত হতে থাকে। মা একদিন আলেয়াকে বলে, আর তো পারছি না মা। মায়ের কথাগুলো আর্তনাদের মতো শোনায়। আলেয়ার বুকের পাঁজর যেন এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে যায়। সামনে তার এসএসসি পরীক্ষা। উপায়ান্তর না দেখে আলেয়া তার স্কুলের হেডমাস্টারের কাছে ছুটে যায়। স্কুলে একজন দপ্তরি নিয়োগ দেওয়া হবে বলে শুনেছিল। হেডমাস্টার সহৃদয় মানুষ। আলেয়ার বাবা তার বন্ধু ছিলেন। সবকিছু শুনে তিনি বললেন, চাকুরীটা তোমাকে দেওয়া যাবে কিন্তু আগে এসএসসি পরীক্ষাটা দাও। আলেয়া বলে, স্যার আগে জীবন তারপর পড়াশোনা। এবার না হোক আগামী বার পরীক্ষা দিব। সে কাজে যোগদানের সুযোগ পায়। শুরু হয় আলেয়ার জীবন সংগ্রাম। ক্রমে পুরো সংসার নির্ভরশীল হয়ে পড়তে থাকে আলেয়ার উপর। সংসারের জোয়াল টানতে গিয়ে এখন সে মাঝ বয়সী আর বার্ধক্যের সন্ধিক্ষণে। কমনীয় আকর্ষণ হীনতায় প্রাণহীন ছোবড়ায় পরিণত হয়েছে। বৃদ্ধা মা আর ছোট ভাই-বোনদের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে কোন দিক দিয়ে সময় পার হয়েছে বুঝতে পারেনি। ছোট ভাই-বোনদের বিয়ে দিলেও ফুরসত হয়নি নিজের বিয়ে নিয়ে ভাববার। ধূসর দৃষ্টিতে আলেয়া তাকিয়ে থাকে অনাগত কোন সম্ভাবনার প্রত্যাশায়।
