
নাফিজা আর অপূর্ব তাদের দীর্ঘদিনের ভালোবাসাকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে চায়। তারা সিদ্ধান্ত নেয় বিয়ে করার। লেখাপড়া শেষ করে চাকরি পাওয়া পর্যন্ত দীর্ঘ অপেক্ষার প্রহর পার করেছে তারা। দু’জন দুটি প্রতিষ্ঠানে বেশ ভালো পদে চাকরি করে। অপূর্ব আর নাফিজার পরিবার তাদের ভালোবাসার কথা জানে। অভিভাবকদের সম্মতিতে এক শুভ লগ্নে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয় অনেক ধুমধামে। বিয়েতে উভয় পক্ষের আয়োজনে প্রয়োজনে কোন কমতি ছিল না। দেনা পাওনা কোন কথা না থাকলেও নাফিজার বাবা-মা দেওয়া থোয়াতে কোন অপূর্ণতা রাখেন নাই।
ভালোবাসার সার্থক পরিণতিতে দু’জনই উচ্ছ্বসিত। নাফিসজার উচ্ছ্বসিত একটু বেশি। সে অপূর্ব হাত ধরে বলে, আমাদের ভালোবাসা এমন থাকবে তো? বিয়ের পর ভালোবাসা কমে যাবে না তো? অপূর্ব বলে, ভালোবাসার বন্ধন পাকাপোক্ত করতেই তো বিয়ে করা। ভালোবাসা কেন কমে যাবে? নাফিজা বলে, তোমার জন্য আমার ভালোবাসা কখনো কমবে না। আমার জন্য তোমার ভালোবাসা কমতি হলে আমি মরে যাব। অপূর্ব নাফিজার কথা শেষ করতে দেয় না মুখ চেপে ধরে। মরে যাবে এমন কথা কখনো বলবে না। মানুষ তো মরণশীল মরতে তো হবেই! সেটা আল্লাহ যখন ডাকবেন তখন।
দুই পরিবারের আসা-যাওয়া বেশ ভালো, আনন্দে কাটছিল দিন। বিয়ের ছয় মাসের মাথায় অপূর্বের বাবা হামিদ আহমেদ বলেন, নাতি নাতনির মুখ দেখতে চান। নাফিজার কানে যায় কথাটা। আমরা বিয়ে করলাম মাত্র, এখনই তো আনন্দ উল্লাস করার সময়। তাছাড়া আমরা দু’জনে একটু গুছিয়ে নেই তারপরে আমরা বাচ্চা নেওয়া যাবে।
হামিদ আহমেদ বলেন, গুছিয়ে নেবে কী? আমার কি কোন কিছু কম আছে? যা আছে তার সব তো আমার একমাত্র ছেলে জন্যই। অপূর্বের মা আবিদাও কন্ঠে একই সুর। বাচ্চা-বাচ্চা করে অস্থির করে তোলেন। নাতি নাতনির মুখ দেখবেন। নাফিজাকে অফিসে যাওয়ার পথে আবার অফিস থেকে ফিরে সেই বাচ্চার কথা শুনতে হয়! অপূর্ব এতদিন চুপ ছিল এবার সেও মা বাবার সুরে তাল মেলাতে থাকে। নাফিজা বলে, ঠিক আছে। সবাই যখন বাচ্চা নিতে বলছে সবার সঙ্গে আমিও একমত। নাফিজার কথা শুনে সবাই খুশি। অপেক্ষার পালা। সময় যায় কিন্তু বাচ্চাকাচ্চার কোন আলামত পাওয়া যায় না।
আবিদা স্বামীর সাথে কথা বলেন। বৌমাকে বললাম বাচ্চা নেওয়ার কথা। সে কথায় তো কানই দিচ্ছে না। বাচ্চা নেওয়ার কথাটা আমাদের খুশি করার জন্য বলছে। কিন্তু আসলে বৌমা বাচ্চা নিতে চায় না। হামিদ আহমেদ আর আবিদা মুখ ভার করে রাখেন নাফিজার সঙ্গে কোন কথা বলেন না। বাচ্চা বাচ্চা করে শান্তির সংসারে অশান্তি শুরু হয়! অপূর্ব চাকরি ছাড়ার কথা বলে নাফিজাকে। পারিবারিক দ্বন্দ্বে নারীকে অস্থিতিশীল করার কৌশল প্রয়োগ শুরু হয়। নাফিজা বলে, আমার চাকরি ছাড়ার কী আছে! আমি চাকরি ছেড়ে করবো কী? নাফিজা তুমি সংসারের দিকে মন দাও। নাফিজা একটু কঠিন হয়, না অপূর্ব আমি চাকরি ছাড়বো না।
তুমি তাহলে আমার কথা শুনছো না?
এখানে কথা শোনা না শোনার কী হলো?
নাফিজা আমাদের সংসারে তো কোন কিছুর অভাব নেই। তোমার চাকরি না করলে চলবে না তেমন তো নয়।
তোমরা কী শুরু করছ? এই বলছো বাচ্চা নেও, আবার বলছো চাকরি ছেড়ে দাও। আমরা চেষ্টা করছি না তেমন তো নয়। একটার পর একটা কথা বলে সব আমার ওপর চাপিয়ে দিচ্ছো কেন?
চাকরি ছাড়তে তোমার অসুবিধা কোথায়?
অসুবিধা কোথাও না কিন্তু আমি চাকরি ছাড়বো না। এই নিয়ে নাফিজা আর অপূর্বের মাঝে শুরু হয় দ্বন্দ্ব। মিলিয়ে যেতে থাকে ভালবাসার সেই প্রাণোচ্ছল উচ্ছ্বাস।
শাশুড়ি একদিন বলেই ফেলেন, বৌমা তোমার কোন সমস্যা আছে তাই তোমার বাচ্চা হচ্ছে না! তুমি ডাক্তার দেখাও। নাফিজা মায়ের সঙ্গে আলাপ করে। মিনারা মেয়েকে বুঝান। শ্বশুরবাড়ির লোকজন নাতি-নাতনির মুখ দেখতে চাইবে এটা অস্বাভাবিক কিছু না। নাফিজা বলে, মা ওরা আমাকে চাকরিও ছাড়তে বলে । মিনারা বলেন, এটা কেমন কথা চাকরি ছাড়তে বলবে কেন? দুনিয়ার সব হিসাবই একরকম। একটা মেয়েকে ঘরে পঙ্গু করে রাখতে চাওয়া! আমি এই ব্যাপারে তোর শাশুড়ির সঙ্গে কথা বলবো। নাফিজা বলে, না মা তোমার কোন কিছু বলতে হবেনা। আবার বলবে মায়ের কাছে নালিশ করেছে। মিনারাও বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত, সে মেয়েকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান। ডাক্তার নাফিজার রিপোর্ট দেখে বলেন, বাচ্চা হওয়ার ব্যাপারে নাফিজের কোন সমস্যা নেই।
মিনারা খুশি হয়ে বলেন, আলহামদুলিল্লাহ আমার মেয়ের কোন সমস্যা নাই! মিনারা মেয়েকে নিয়ে তার শ্বশুর বাড়ি যান। বিয়াই বিয়াইনের সঙ্গে সরল মনে কথা বলেন। আল্লাহর রহমতে আমার মেয়েরে কোন সমস্যা নেই! এই যে দেখেন ডাক্তারি রিপোর্ট! আপনি কোন ডাক্তারকে রিপোর্ট দেখাতে পারেন। কিংবা আমার মেয়েকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যেতে পারেন। সন্তান হয় নাই হবে, এ নিয়ে আপনাদের নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করেন না। আবিদা রাগ হয়ে বলেন, আপনার মেয়ে বুঝি এই নিয়ে আমাদের নামে নালিশ করেছে? তার জন্য ডাক্তারের রিপোর্ট নিয়ে আপনাকে আমার বাড়িতে আসতে হয়েছে। বেয়াইয়ের কথায় মিনারা অপ্রস্তুত হয়। ভুল বুঝবেন না। আপনাদের সংসারে যাতে অশান্তি না বাড়ে সেই জন্য আমার এই কাজটা করা। বিয়াই বিরক্তির স্বরে বলেন, হয়েছে আর বলতে হবে না।
নাফিজা শ্বশুর বাড়ির সকলের বারণে চাকরি ছেড়ে দেয়। যাতে সংসারে শান্তি থাকে। কিন্তু শান্তি কোথা থেকে আসে। তাদের একটাই কথা সংসারে বাচ্চা চাই। নাফিজা সতর্কতার সঙ্গে অপূর্বকে বোঝাতে চেষ্টা করে। দেখো এটা একটা যৌথ বিষয়। চলো আমরা দু’জনে একসঙ্গে ডাক্তারের কাছে যাই। আজকাল চিকিৎসার কত উন্নতি হয়েছে। নিশ্চয়ই কোন সমাধান পাওয়া যাবে। অপূর্ব ক্ষিপ্ত হয়ে বলে, আমি যাব ডাক্তারের কাছে? খেয়ে দেয়ে আমার কোন কাজ নেই।
হামিদ আহমেদ এক প্রকার সিদ্ধান্ত নেয় সে ছেলেকে বিয়ে করাবেন। ছেলের জন্য মেয়ে দেখা শুরু হয়। শুনা যায় মেয়েও ঠিকঠাক হয়েছে। নাফিজা বেসামাল হয়ে পড়ে মহা আয়োজন আয়োজন দেখে। এইসব কথা সে তার মাকে জানায়। নাফিজার মা বলেন, আমার মেয়ে থাকতে যদি আর কোন বিয়ে করা হয় তাহলে আমি মামলা করব! আইনের আশ্রয় নিতে বাধ্য হব! নাফিজা অপূর্বের ভালোবাসার নদী যেন শুকিয়ে গেছে। তিক্ত বিরক্তিতে ভরে উঠেছে মন। কেউ কারো সঙ্গে কথা বলে না। নাফিজার মা মেয়েকে নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু নাফিজা যেতে চায় না। আমার যদি মৃত্যু আসে আমার স্বামীর বাড়িতে হবে। আমার স্বামী যদি বিয়ে করে আমার লাশের উপর দিয়ে গিয়ে বিয়ে করবে।
অপূর্বের বিয়ের ব্যাপারে তার নীরবতা ‘মৌনতা সম্মতির লক্ষণ’ মনে করা হয়। উপায়ান্তর না দেখে নাফিজা বিষ খাবার প্রস্তুতি নেয়। অপূর্ব তা দেখে নাফিজাকে জাপটে ধরে। হাতে থেকে বোতল নিয়ে ফেলে দেয়। অপূর্বের মাঝে হঠাৎ পরিবর্তন আসে। বুঝতে পারে সে কত বড় ভুল করতে যাচ্ছিল। যাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছে আজ তার পাশে না দাঁড়িয়ে একি করছে সে। অসহায়ের মতো কাঁদছিল নাফিজা। অপূর্ব তাকে সজোরে বুকে টেনে নেয়। না আমি বিয়ে করবো না নাফিজা তোমাকে রেখে! আমার ভালোবাসার মানুষ তুমিই, থাকবে আমার আজীবন সঙ্গী হয়ে। দু’জনে একসঙ্গে ডাক্তারের কাছে যায়। ডাক্তার বলেন, বিয়ে করার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত দ্রুত নিতে পারে মানুষ কিন্তু ডাক্তারের কাছে যাবার মতো সহজ সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করে। আশা করছি আপনাদের সমস্যা মিটে যাবে। আল্লাহর অশেষ মেহেরবানীতে বছর না ঘুরতেই নাফিজা গর্ভবতী হয়। সন্তান আগমনের সংবাদে পুরো বাড়িতে আনন্দর রোল পড়ে যায়। অপূর্ব আর নাফিজার ভালোবাসার নদীতে আবার জোয়ার আসে, দুই কূল প্লাবিত করে বয়ে চলে অবিরল ধারায়।

