
মুনা আর দীপা দুই বোন। দুর্ভাগ্য এমন তাদের বাবা মা দু’জনেই মারা গেছেন। পিতৃমাতৃহীন হবার দুঃসময়ে মামা নাদিম আহমেদ এগিয়ে আসেন। তিনি দুই ভাগ্নির দায়িত্ব নেন। ভাগ্নি দু’জনকে নিজের সন্তানের মতো পালন করতে থাকেন। বাড়িতে এসে আগে দুই ভাগ্নির খবর নিয়ে তারপর অন্য কিছু করেন। মুনা দীপাও মামাকে ভালোবাসে ও সমীহ করে। মামা তাদের কাছে বাপ এবং মায়ের সমান। নাদিম আহমেদের সর্বদা চেষ্টা মুনা আর দীপাকে বাবা-মায়ের অভাব বুঝতে না দেয়া। নাদিম আমাদের ইচ্ছা ভাগ্নি দু’জনের পড়াশোনা শেষে হলে ভালো পাত্র দেখে বিয়ে দিবেন। মুনা আর দীপা মামাকে একটু চুপচাপ দেখলেই বলে, মামা তুমি কী ভাবছো? কোনো ভাবনা চিন্তা একদম চলবে না। চিন্তা ভাবনা করে তুমি অসুস্থ হবে তা আমরা হতে দেবো না। নাদিম বলেন, নারে মা ভাবি কই? এই তোদের নিয়ে একটু চিন্তা হয়। দুই বোন সমস্বরে বলে ওঠে, আমাদের নিয়ে চিন্তা হওয়ার কী আছে। তুমি তো আমাদের কোন কিছুই অপূর্ণ রাখোনি। মামা বলেন, ঠিক আছে আমি কোন কিছু নিয়ে আর চিন্তা করবো না। যাতে আমার মামণিদের উদ্বেগ কমে যায়।
মুনার বিয়ের জন্য ভালো পাত্র পাওয়া যায়। পাত্র সরকারি চাকরি করে। আয় রোজগার ভালো। এমন ভালো পাত্র হাতছাড়া করতে চায় না নাদিম আহমেদ। মুনার বিয়ে হয়। মুনার স্বামী রাফিন দেখতে সুদর্শন। দেখতে সুদর্শন হলেও মন তার সুন্দর নয়। বিভিন্ন মেয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক। মুনা সেটা জানতে পারে। এ প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে হোঁচট খায় মুনা। রাফিনের কথা, স্ত্রী হয়ে আছ ভালো কিন্তু আমার উপর কর্তৃত্ব খাটাতে চেষ্টা করো না। আমার যা ইচ্ছা আমি করবো। এখানে কারো বাধা বিঘ্ন চলবে না। মুনা চুপচাপ কথাগুলো শুনে কোন প্রতি উত্তর করে না। নিরবে স্বামীর অত্যাচার হজম করে, কখনো মামাকে জানায় না। মামার দেখে দেওয়া ভালো পাত্রের কুকীর্তির কথা জানতে পারলে মামা কষ্ট পাবেন। মামাকে কষ্ট দিতে চায় না সে। রাফিনের প্রকৃত রূপ ধীরে ধীরে প্রকাশিত হতে থাকে। সংসারে কোন খরচ খরচা দেয়ায় উদাসীনতা শুরু করে। অবস্থা চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। মুনা কী খাবে কী পড়বে তা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে। নিরুপায় মুনা একটা স্কুলে চাকরি নেয়। সংসারে খরচ সে চাকরির টাকা দিয়ে চলে।
সময় বসে থাকে না। মুনার এক ছেলে এক মেয়ে। তারা বাবাকে ঠিকমতো কাছে পায় না। এ নিয়ে মুনা স্বামীকে বলে, আমাকে স্ত্রী হিসাবে অগ্রধিকার নাই দাও। অন্ততপক্ষে তোমার সন্তানদের তো বাবার আদর ভালোবাসা দাও। রাফিনের কথা, আমি সময় পাই কই? আমি যেখানে চাকরি করি আমার সেখানেই পরে থাকতে হয়। সন্তানদের দেখার জন্য তোমাকে রাখছি তুমি দেখবা। মুনা বলে, চাকরি তো আমিও করি তাই বলে কি আমি সন্তানদের সময় দেই না? ভালোবাসি না? রাফিন উচ্চস্বরে বলে, আমার সামনে বকবক করবা না আমি বকবক পছন্দ করি না।
মুনা হঠাৎ অসুস্থ হয়। অসুস্থ হলে ডাক্তারের কাছে যাই যাই করে যাওয়া হয় ওঠেনা। একসময় সে এতই অসুস্থ হয়ে পড়ে যে, ডাক্তারের কাছে না গিয়ে উপায় থাকে না। ডাক্তার বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার রিপোর্ট দেখে জানান, মুনা ক্যান্সারে আক্রান্ত। আকাশ ভেঙ্গে পড়ে মুনার মাথায়। কী হবে এখন। তার সময় নাই পৃথিবী ছেড়ে যেতে হবে। প্রথমেই মনে হয় ছেলে মেয়ের কথা। ছেলে-মেয়ের কী হবে! সে মারা গেলে তার স্বামী সন্তানদের কতটুকু দেখবে তা নিয়ে সন্দেহ আছে। মুনা তার অসুস্থতার কথা কাউকে বলে না। দিন যায় অসুস্থতার সঙ্গে মুনার চিন্তা বাড়তে থাকে। সন্তানের মুখের দিক নির্বাক তাকিয়ে থাকে ভাবে, মাকে ছাড়া তারা কিভাবে কেমন থাকবে! দু’চোখে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু ধারা। অবধারিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পায়না মুনা। একদিন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। মামা নাদিম আহমেদ আর বোন দীপা আসে। তাদের আফসোস কেউ কোন কিছু করার সুযোগ পেল না। কেন তুই জানাস নাই তোর ক্যান্সার হয়েছে! নাদিম আহমেদ ভাগ্নির মৃত্যুতে খুবই ভেঙে পড়ে। বুকের মাঝে হাহাকার! মা বাপ মরা মেয়ে আমি ওদের নিজের সন্তানের মতো লালন পালন করেছি। আমি বেঁচে থাকতে ওদের মৃত্যু দেখতে হবে, এ আমি চাইনা! মুনা মারে তোর মামাকে তো কিছু বলে গেলি না। দীপা ভাগ্নে, ভাগ্নির দেখভাল করে।
রাফিন স্ত্রীর মৃত্যুর ছয় মাসের মাথায় বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয়। মুনার সন্তানেরা কিছুটা বুঝতে শিখেছে। বাবা বিয়ে করলে সৎ মায়ের জ্বালা যন্ত্রণার কথা শুনে ভয়ে ভীত হয়ে পড়ে। চারিদিকে কথাবার্তা শুনে তাদের মনে এক ধারণা সৃষ্টি হয়। তার খালাকে বলে, খালা তুমি আমার বাবাকে বিয়ে করো। কিন্তু দীপা বিয়ে করতে রাজি হয় না। জানে রাফিনের চরিত্র ভালো না। বিভিন্ন মেয়ের সঙ্গে তার উঠা বসা। সে এমন স্বামী নিয়ে কেমন করে জীবন কাটাবে! ভাগ্নে, ভাগ্নিকে সে বিরত করে। রাফিনের মা নাহিদা ছেলের জন্য অন্যত্র মেয়ে দেখে। মেয়ে দেখে তাদের পছন্দ হয়। কথাবার্তা ও ঠিক হয়ে যায়। এ কথা মাহিম ও রিয়া জেনে দাদিকে বলে, দাদি তুমি বাবাকে অন্য জায়গায় বিয়ে করিও না। নাহিদা নাতিদের কাকুতি দেখে বলেন, ঠিক আছে তোমার বাবাকে বিয়ে করাবো না। কিন্তু তোমার বাবাকে তো বিয়ে করতে হবে না হলে সংসার দেখবে কে? মাহিম এবং রিয়ার মাথায় আগেই এ কথার উত্তর তৈরি ছিল। তারা বলে, ঠিক আছে দাদি সংসার দেখার জন্য মানুষ দরকার? তাহলে তুমি আমার খালাকে বাবার সঙ্গে বিয়ে দাও। সে আমাদের ভালোবাসবে আদর যত্ন করবে।
দুই নাতিকে নিয়ে নাহিদা দীপার মামার কাছে যায়। প্রস্তাব করেন দীপাকে তার ছেলের বউ করে নিবেন। নাদিম আহমেদ বিবেচনা এবং বাস্তবতার কথা বলেন। আমি ওদের আমার সাধ্যমত যত্নে মানুষ করেছি। দীপা মেয়েটা অবিবাহিতা। আমি চাইনা বিবাহিত দুই সন্তানের বাবার জন্য দীপাকে দিতে। কিন্তু নাতিদের দাবি ফেলে দেওয়া আমার জন্য কষ্টের। আমি এখন উভয় সংকটে আছি। রাফিনের মা বলেন, আমার ছেলের বিয়েও প্রায় ঠিক হয়ে আছে। আপনার কথার উপরে আমি সেখানে হ্যাঁ, না বলব। নাদিম আহমেদ কী করবে বুঝতে পারে না। দীপার মুখের দিকে তাকান। দীপা মামা ও ভাগ্নে, ভাগ্নির মুখের দিকে তাকায়। ভাগ্নে, ভাগ্নির জন্য খুব মায়া হয় তার। হঠাৎ করে এই বিয়েতে তার সম্মতির কথা জানায়। নাদিম আহমেদ বলেন, মারে তুই একটু ভেবে দেখ। না মামা আমার আর ভাবা ভাবির কিছু নেই। আমার ভাগ্নে-ভাগ্নি যেখানে আমাকে মা হিসেবে পেতে চায়। সেখানে আমি অমত করি কিভাবে? দীপা বিয়েতে রাজি হয়ে যায়। রাফিন ও দীপার বিয়ে হয়। মাহিম আর রিয়া খালাকে মা হিসেবে পেয়ে খুব খুশি। খালা তাদের খুব ভালোবাসে। দীপা সন্তান নিতে চায় না, মনে করে এই মাহিম আর রিয়া তার সন্তান। ওদের বুকে করে আনন্দের এক সংসার গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখে সে।
