
দুনিয়ার সব মানুষের জীবন সমস্যা দিয়ে আস্টে পৃষ্ঠে বাধা। ধনী গরিব যেই হোক সমস্যা থেকে কারো মুক্তি নাই। অকালে স্বামীহারা হওয়া এই সমস্যার বুঝি আদি অন্ত নাই। নাবালক সন্তান সন্ততি যদি থাকে তাহলে তার ভোগান্তি হয় সীমাহীন। যেমন আলোদের সংসারের সংগ্রাম। প্রতিবেশী তাহেরা বলেন, আলোর মা তোমার জীবনের লড়াই দেইখা আমরাই হাঁপাইয়া উঠি। স্বামী ছাড়া বাচ্চা দুইটা নিয়া কী লড়াই না করতাছো। তুমি পারো বটে। ফাহিমা চিন্তিত মনে উত্তর দেন, পারতে হয় বুবু পরিস্থিতি তাকে পারায়! তাহেরা হেসে বলেন, দোয়া করি তুমি মেয়ে দুইটা নিয়ে সুখে শান্তিতে থাকো। বাপ না থাকলেও মেয়ে দু’টারে তুমি অনেক আদর যত্নে মানুষ করতাছো। ফাহিমা বলেন, কপাল! এখন বাবাও আমি মাও আমি। মেয়ে দু’টার সব আবদার তো মিটাতে পারিনা, ভালোবাসা আদর যত্ন দিয়া সেটুক পুরা করার চেষ্টা করি। আজ তাহলে উঠি, তাহেরা প্রসন্ন চিত্তে ফিরে যান।
আলো হাঁপাতে হাঁপাতে কলসি করে পানি নিয়ে আসে। তা দেখে ফাহিমা ব্যস্ত হয়ে পড়ে, মা আমার তোমারে পানি আনতে কে কইছে?
আলো বলে, কলসি খালি দেখলাম, তাই নিয়া আইলাম।
ফাহিমা বলেন, আমার মায়ের কোন কাজ করতে হইব না। আমি বাঁইচা থাকতে আমার মায়ের কেন কাজ করতে হইব? মেয়েকে জড়িয়ে ধরে আদর করে দুই গালে দুই চুমো দেয়। ছোট মেয়ে লিমা দুর থেকে দেখে ছুটে আসে, মা আমার গালেও চুমু দাও। ফাহিমা ছোট মেয়েকেও আদর করে। ওরে আমার ছোট মা, বলে, দুই গালে দুই চুমু দেন।
ফাহিমার চিন্তা জোড়া তালি দিয়ে আর চলে না। সংসার চালানোর একটা উপায় বের করা দরকার। কদিন বিভিন্ন জায়গায় ঘুরা ফেরা করে একটা ধারণা আসে মাথায়। সে ছোট্টো করে একটা মুরগির খামার করতে পারে। যা তার সাধ্য আর সামর্থ্যের মধ্যে হতে পারে। নিজের যা ছিল আর কিছু টাকা লোন করে একটি মুরগির খামার গড়ে তোলে। প্রথমের কিছু সমস্যা কাটিয়ে উঠে ভালোই চলতে থাকে ব্যবসা।
ফাহিমা হঠাৎ করে অসুস্থ বোধ করেন। ডাক্তারের কাছে যায় কিন্তু চিকিৎসার কোন অগ্রগতি হয় না। দিন দিন শরীরটার খুব খারাপের দিকে যায়। আস্তে আস্তে তাঁর বিছনায় পড়ে যাবার উপক্রম হয়। দারুণ চিন্তায় অসুস্থা আরও বেড়ে যায়। তাঁর কিছু হয়ে গেলে মেয়ে দুটোকে দেখবে কে? মেয়ে দু’টাকে বুকে জড়িয়ে কান্নাকাটি করে। লিমা কিছু বুঝতে না পারলেও আলো ভালো মন্দ বোঝে। মা, তুমি ভেঙ্গে পড়োনা। তোমার কিছু হবে না। আমাদের বাবা নেই মা ও কি তাহলে পৃথিবীতে থাকবে না! ছোট দুটো বোনের কী উপায় হবে? সংসারের সমস্ত কাজের দায়িত্ব চলে আসে আলোর উপর। অসুস্থ মায়ের সেবা যত্ন, ছোট বোনকে গুছিয়ে স্কুলে পাঠানো, তারপর সংসারের সমস্ত কাজ। আলো এতো কাজের ফাঁকে নিজের পড়ালেখাটাও চালিয়ে যেতে চেষ্টা করে। সবকিছু সামাল দিতে গিয়ে মাঝে মধ্যে সে অস্থির হয়ে পড়ে। তারপরও হাসিমুখে সবকিছু মানিয়ে নেয়।
সমাজ সংসারে বেশির ভাগ সাধারণ মানুষ, দুঃখ কষ্টের মাঝে যে ভাবে বাস করুক তার চায় নিরুপদ্রব শান্তির জীবন। সর্ব কালের বাস্তবতা তেমনটি কখনো হয়ে ওঠে না। বিরাট জন গোষ্ঠীর এক বা কয়েক জন জগদ্দল পাথরের মতো বাধ হয়ে দাঁড়ায়। একজন আরেকজনের অশান্তির কারণ হয়ে ওঠে। যেমন মোকলেছ। এলাকার ক্ষমতাবান মানুষ সে। প্রায় মুরগি নেয় আলোর কাছ থেকে। টাকা দেই দিচ্ছি বলে দেয় না। আলো টাকা চাইলে তাকে ভয় দেখায়! তুই যদি আমার কাছে টাকা চাস তাহলে তোদের ব্যবসা বন্ধ করে দেব। তোকে মেরে ফেলবো। এমনকি তোর মা বোনকেও মেরে ফেলবো! আলো ভয়ে মোকলেছের কাছে টাকা চায় না এবং ভীতির হুমকির কথা কাউকে বলে না। যে বয়সে আলোর হেসে খেলে বেড়ানোর কথা। সে বয়সে আলোর উপরে পড়ছে সংসারের কঠিন দায়িত্ব। দিন দিন আলোর খামার থেকে মুরগি কমে আসছে। সে চিন্তা করে কী করে মায়ের ঔষধ, তাদের সংসার খরচ চলবে। এর মাঝে মোকলেছ এসে মুরগি চায়। আলো মুরগি দিতে না চাইলে তাকে থাপ্পড় মারে। মোকলেছ নিজ হাতে খামার থেকে মুরগি নিয়ে যায়। অসহায়ের মতো দেখা ছাড়া আর কিছুই করতে পারে না আলো। বুকটা তার ফেটে যায়।
ফাহিমা রুগ্ন কন্ঠে ধিরে ধিরে মেয়েকে ডাকে। আলো চোখের অশ্রু মুছে মায়ের কাছে যায়, কী হয়েছে মা ডাকছো কেন? মা বলেন, কেমন জানি তোর কান্নার শব্দ পেলাম? না মা আমি তো কান্না করিনি। মাকে আশ্বস্ত করে আলো। মা মেয়েকে কাছে ডাকে, মা তোর মাথাটা আমার বুকে একটু রাখতো। পরানটা জুড়াইয়া নেই। আলো মায়ের বুকের উপর মাথা রাখে আর কাঁদতে থাকে। ফাহিমা মেয়েকে জিজ্ঞেস করেন, কিরে মা কাঁদছিস কেন? রুদ্ধ স্বরে আলো বলে, মা তোমার যদি কিছু হয় আমাদের দুই বোনের কী হবে? মা বলেন, না মা আমার কিছু হবে না। মাথার উপর আল্লাহ আছেন, চিন্তা করিস না ভেঙ্গে পরিস না।
সকালে ঘুম থেকে উঠে আলো দেখে খামারে কোন মুরগি নাই সব চুরি হয়ে গেছে। আলোর বুক ফাটা চিৎকার, একি হলো? আমাদের সব শেষে মা। ফাহিমা বিছনায় শুয়েই আহাজারি করেন। এই ছিল তাদের সম্বল সেই সম্বলটুকু চুরি হয়ে গেল। কার এমন ক্ষতি করেছিল সে। কে এমন সর্বনাশা করল! দু’হাত তুলে আল্লাহকে ডাকেন। তুমি আমাকে সুস্থ করে দাও। আরেকবার আমি জীবন যুদ্ধে নামতে চাই। না হলে এই দুইটা অসহায় মেয়ের কী উপায় হইবে! আল্লাহ তুমি রহমত করো।
আল্লাহর দরবারে বোধ হয় সেই আর্জি পৌঁছেছিল। আল্লাহর রহমত আর আলোর সেবা যত্নে তার মা ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন। ফাহিমা অক্লান্ত পরিশ্রমে ব্যবসাটা আবার দাঁড় করান। পরিচালনা করে সতর্কতার সাথে। মায়ের সুস্থতা আর সংসারের সচ্ছলতায় দুই বোন আলো আর লিমা খুশি। এখন তারা মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করে। সংসারের সুখে মনে তাদের আনন্দ উল্লাস। ফাহিমা জীবন সংগ্রামে জয়ী হন।
