
অবিস্মরণীয় দুই শক্তি তৈরি করেছেন বিধাতা। এক পুরুষ, অপরটি প্রকৃতি বা নারী। দুই শক্তির মিলিত প্রচেষ্টায় আবর্তিত পৃথিবী। লালন ফকির যথার্থই বলেছেন, চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে আমরা ভেবে করবো কি। রকিবুল লালন ভক্ত। রকিবুল আর আলেয়া সংসারে দিনা তাঁদের বড় মেয়ে। স্বামী স্ত্রী দু’জনে আলাপ করেন জীবিত থাকতেই সন্তানের দায়িত্ব পালন করে যেন মরতে পারি। তাতে মরেও শান্তি। তারা মেয়ের বিয়ে নিয়ে উদ্বিগ্ন। রকিবুল ইসলাম বললেন, দিনার মা ঘটকের সঙ্গে কথা হয়েছে। ঘটক শুক্রবার শুভ দিন ঠিক করেছে। পাত্র পক্ষ আসবে যদি তাদের পাত্রী পছন্দ হয় তাহলে আলহামদুলিল্লাহ। বিয়ে পাকা কথা সেরে ফেলা হবে। আলেয়া স্বামীর কথায় একমত হন। দিনা দরজার আড়াল থেকে কথা শুনছিল। বাবা মাকে উদ্দেশ্য করে বলে, আমি বিয়ে করবো না এখন। সামনে আমার এসএসসি পরীক্ষা। পড়ালেখা করবো। রকিবুল ইসলাম লালন ভক্ত হলেও লালনের তত্ত্ব ধারণের সক্ষম হয়নি। সে ধমক দিয়ে বলেন, বাবা মায়ের কথা আড়াল থেকে শোনা বেয়াদবি। বাবা মা যা করে সন্তানের ভালোর জন্যই করে। বাবার ধমক শুনে দিনা কথা বলে না। নিজের ঘরে চলে যায়।
ঘটক পাত্র পক্ষ নিয়ে যথাসময়ে হাজির। মজিদ ঘটক বলেন, রকিবুল ভাই যে পাত্র আনছি পছন্দ না হইয়া পারে না। আমি যে কাজ করি বুঝে শুনে করি। দিনার মা মেয়ের সাজগোজের তদারকি করতে যান। দিনা তুই এখনো রেডি হোস নাই। লোকজন এসে বসে আছে। দিনা বলে, মা আমি তাদের সামনে যাবো না। মেহমান বসে আছে আর তুই এসব কী বলছিস? তোর এ কথা জানলে তোর বাবা কি করবে জানিস? দিনা ক্ষুব্ধ অভিমানে বলে, আমার ব্যাপারে আমার মতামতের, সিদ্ধান্তের কি কোন অধিকার নেই! তুই এসব কী বলিস! আমরা কি তোকে পানিতে ফেলে দিচ্ছি? পানিতে ফেলে দিচ্ছ না তো কী? তোমাদের কাছে মেয়ের কথার মূল্য নেই। মেয়ে জন্ম দিয়ে যেন পাপ করে ফেলেছ। এখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেই পাপ থেকে মুক্ত হতে চাও। মা করুন কন্ঠে বলেন, মেহমান বসে আছে তুই আর কথা বাড়াইস না। দিনা প্রচন্ড হতাশা আর বিরক্তি নিয়ে মেহমানদের সামনে হাজির হয়। পাত্রপক্ষ দিনাকে যতভাবে দেখা সম্ভব দেখে। মুখের কাপড় সরিয়ে, মাথার থেকে কাপড় সরিয়ে, জুতা ছাড়া খালি পায়ে হাঁটিয়ে। সব প্রকারে দেখে আরো কোন প্রকার থাকলে তাও দেখত। দিনা ভাবে, এরা কী সভ্য জগতের মানুষ না অন্য কিছু। কনে দেখতে দেখতে আইছে না হাটে গরু কিনতে আইছে। যাচাই বাছাই শেষে বর পক্ষের মেয়ে পছন্দ হয়। শুভক্ষণ দেখে বিয়ের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। বিয়ে হয়ে যাওয়া যেন মহা আনন্দের ব্যাপার। মেয়ের বিয়ে দিয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচার স্বার্থপরতা যুগ যুগ ধরে মহৎ কর্ম হিসাবে বিরাজ করছে সমাজে। দিনা কিছুতেই মেনে নিতে পারে না, সে কান্নাকাটি করে। রাকিবুল ইসলামের কন্ঠে শাসনের দৃঢ়তা। এত কান্নাকাটির কী হলো? শ্বশুর বাড়ি যাওয়াই হলো মেয়েদের আসল কাজ। তাড়াতাড়ি বিয়ে হলে সংসার গোছানোর সময় বেশি পাওয়া যায়। মেয়েকে উপযুক্ত সময় বিয়ে না দিতে পারলে ওই মেয়ে নিয়ে বাবা মার ভোগান্তির অন্ত থাকে না।
দিনার বিয়ে হয়। সে শ্বশুর বাড়ি যায়। শুরু হয় তার জীবনে নতুন অধ্যায়। কাল মহাকাল পেরিয়ে সময় যত এগিয়ে যাক নববধূর ললাট লিখন থাকে অপরিবর্তিত। বিয়ের সাজেই দিনাকে স্বামীর বাড়ির কাজের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়। দিনার স্বামী শাহেদের কথা, আমার বাবা মা যা বলবে সেভাবে চলবা। তাদের হুকুম দিতে দেরি আছে হুকুম পালনে যেন দেরি না হয়। বিয়ের আগে যেভাবেই চলুক বিয়ের পরে বঙ্গ সন্তানদের যেন মাতৃপ্রেম বেশি জাগ্রত হয়ে ওঠে। সংসারে অনেক সর্বনাশের কারণ এই অহেতুক মাতৃ প্রেম। দিনা মৃদু প্রতিবাদ করে স্বামীর কোথায়। বিয়ের লাল শাড়ি গা থেকে না খুলতেই স্বামীর বাড়ির হুকুম পালন করার আদেশ। শাহেদ বলে, মেয়েদের জন্মই হইছে স্বামীর বাড়ির হুকুম পালন করতে। এক হাতে রান্না করবে আরেক হাতে অন্য কাজ। স্বামীর দিকে তাকিয়ে দিনা বলে, এমন নির্দেশ থাকলে হয়তো পালন করতে হবে কিন্তু সেটা কতটা সঙ্গত হবে। সে ভাবে, বাবার বাড়ি আদেশ, স্বামীর বাড়ি আদেশ মেয়েদের শুধু আদেশ পালন করতেই জীবন পার হয়ে যায়। তাদের জীবন গঠনে পরে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া। দিনার শ্বশুর বাড়িতে অনেক কাজ, কাজও শেষ হয় না বাপের বাড়ি যাওয়া হয় না। সেখান থেকেও কেউ নিতে আসে না।
দিনার গর্ভে সন্তান। বিরামহীন সাংসারিক কাজ থেকে তার নিস্তার নাই। একদিন তার শরীরটা খারাপ লাগছিল তাই একটু চুপচাপ বসে ছিল। শাশুড়ি লতিফা বলেন, আ বৌমা তুমি বসে আছো? সংসারে কত কাজ পড়ে আছে। মা শরীরটা ভালো লাগছে না। কী কও না কও তুমি? শরীরটা ভালো লাগছে না। আমরা বাচ্চা পেটে নিয়ে কত কাজ করছি! আর তুমি বাচ্চা গর্ভধারণ কইরা বাচ্চার বাহানা দিচ্ছো। নিরুপায় দিনা বলে, মা সবার শরীর তো একরকম না কেউ পারে কেউ পারে না। সবাই পারলে তুমি পারবা না কেন? আমরা স্বামীর সংসার সামলাই নাই। সেই একটুখানি বয়সে আমরা স্বামীর বাড়ি আইছি আজ মাথার চুল সাদা হইছে। এই পর্যন্ত বয়স পাড়ি দিলাম স্বামীর বাড়ি কাজ কইরা। চুলে পাক ধরছে, স্বামীর ভালো-মন্দ চিন্তা করেই কাজ করে গেলাম ডাইনে বায়ে তাকাইলাম না। আর এখনকার বউ ঝিয়েরা শরীরে কত সুখ চায়। দিনা আস্তে আস্তে বিড়বিড়িয়ে বলে, একটু কাজ থেকে বসলাম না যেন শাশুড়ির কথার বোঝা মাথায় নিলাম।
দিনা ছেলে সন্তানের মা হয়েছে। শাহেদ খুব খুশি সে ছেলের বাবা হয়েছে। দিনা বলে ছেলে আমাকে মা বলে ডাকবে তোমাকে বাবা বলে ডাকবে। কবে যে শুনবো সেই ডাক! আমি কাজ করবো আমার কাপড়ের আঁচল ধরে ছেলে পিছে পিছে হাঁটবে। কী যে ভালো লাগবে আমার। শ্বশুর বাড়ি আসার পর স্বামীর মুখ থেকে দিনা কখনো ভালো পাঁচটা কথা শুনতে পায়নি। আজ ছেলের উপলক্ষে স্বামীর আনন্দ উল্লাস দেখে দিনার খুব ভালো লাগছে। বিভিন্ন কাজ সামাল দিতে গিয়ে সেদিন দিনার রান্নায় দেরি হয়ে যায়। গোয়াল ঘরে কয়েকটা গরু আছে, গরু ঘরে তাগারিতে পানি দিতে হবে। এদিকে স্বামী জমি দেখে ফিরে আসবে। বিভিন্ন চিন্তায় অস্থির। সময় মতো রান্না না হলে না জানি কী হয়! এইদিকে ছেলেও কান্নাকাটি করছে। দিনা রান্না তখনো হয় নাই সেই ভয়ে আতঙ্কিত। শাহেদ বাড়িতে ঢোকার আগেই ছেলের কান্না শুনে। এদিকে দেখে চুলায় রান্না চারিদিকে চুলার ধোঁয়া। গরু ঘরে তাগারিতে পানি নাই জিজ্ঞেস করে বাড়িতে বসে কী করছিলি তুই? শাহেদ রাগে ফেটে পরে। কলসিতে পানি নাই, রান্না হয় নাই, গরু ঘরে পানি নাই, ছেলে কাঁদছে। বাড়ি ফেরার পথে এক প্রতিবেশী সঙ্গে বাদানুবাদ করায় মেজাজ ছিল চড়া। হাতে কাছে পেল গরু পেটানোর লাঠি। তা দিয়ে দিনাকে মারা শুরু করে। বলে বাড়িতে বসে কী করছিস? কোন কিছুই ঠিক মতো করতে পারিস না। দিনা চিৎকার করে। বলে, এত কাজ করি তারপরও তোমাদের চোখে পড়ে না। বাচ্চা সামলাও এইটা করো ওইটা করো, সংসারের সমস্ত কাজ আমার মাথার উপর। সবই তো আমাকে করতে হয়। শাহেদ চিৎকার করে বলে, তুই করবে না করবে কে? তোরে আনছি তো সংসারের কাজ করার লাইগা। তোর আনছি কি রাজ রানীর মতো বসাইয়া খাওয়াইতে? ওপাশ থেকে লতিফা আওয়াজ করে বলেন, তুমি কী কাজ করো? এই কাজ কি আমরা করি নাই। ঘর সংসার কি আমরা সামলাই নাই। এইটুকু তো কাজ। পারো না সময়ের কাজ সময়ে শেষ করতে। আর নাতি তো আমিই সামলাই। তারপরও সংসারের কাজ কেন করে উঠতে পারো না। দিনা বলে, সব কিছুই ঠিক সময় মতো করি একদিন একটু গরমিল হয়েছে তাই সব রাগ ঢালো আমার পিঠের উপর দিয়ে। কী করা বাবা মা বিয়া দিছে শ্বশুরবাড়ির গাধার খাটুনি খাটতে। শাহেদ উত্তেজিত হয়ে বলে, আবার খোঁচা মেরে কথা বলিস? কোন কিছু পারবি না তো বাপের বাড়ি চইলা যাবি। তোর বাপে যদি তোরে বসাইয়া খাওয়ায় তাহলে খাওয়াক। আমি তোরে বসাইয়া খাওয়াইতে পারব না।

সময়ের প্রবাহ ঘটনার প্রতিবন্ধকতায় আটকে যায় না। জীবন ক্রমাগত এগিয়ে চলে তার অন্তিম লক্ষ্যে পৌঁছাতে। শাহেদ আর দিনা এখন দুই সন্তানের পিতা-মাতা। এখন অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। এক ছেলে এক মেয়ের বাবা মা তারা। ছেলে মেয়ের মুখ দেখে বিগত জীবনের দুঃখ-কষ্ট মুছে গেছে দিনার। দুই সন্তান বড় হয়েছে। শাহেদ বলে, ছেলে মেয়ের বিয়ের বয়স হয়েছে। আগে মেয়ের বিয়ে দিতে হবে, তারপর ছেলেকে বিয়ে করাতে হবে। দিনা বলে যুগ পাল্টে গেছে এখন বাবা-মার কথায় চলে না। ছেলে মেয়ে যে সিদ্ধান্ত নেয় সেই সিদ্ধান্তই সিদ্ধান্ত। তোমার আমার যুগ পাড়ি দিয়ে এসেছি। এখন আধুনিক যুগ। শাহেদ বলে, ছেলে মেয়ে আশকারা দিয়ে মাথায় তুলো না। আমার বাবা-মা যেভাবে পাড়ি দিয়ে আসছে, আমরা ও যেভাবে পাড়ি দিছি সেই ভাবেই ছেলে মেয়ের চলতে হবে। আমরা বাবা মার হুকুমে চলছি তাই বলে কি আমাদের জীবন ভালো চলে নাই। বাবা মা যা করে সন্তানের ভালোর জন্যই করে। দিনা বলে, দেখো পারো কিনা। তবে আমি ছেলে মেয়ে যা বলবে তাই করতে চাই। ছেলে মেয়ের ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা বাবা-মা পূর্ণ না করলে কে করবে। ঘর সংসারী হলে মেয়েদের স্বামীর কথা আর ছেলেদের শুনতে হয় বউয়ের কথা। এভাবেই চলছে জগত সংসার। ছেলে মেয়ে যেভাবে চলতে চায় আমি সেভাবেই চলতে চাই। মা তুমি আছো বলেই আমাদের সব আশা পূর্ণ হয়। আজ আমরা পড়ালেখা করে মানুষের মতো মানুষ হয়েছি। সব তো মা তোমার অবদান। দিনা ও দুই সন্তানকে দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে তোরাই তো আমার সুখ। ভবিষ্যতে তোমরা ভালো থাকো এই আমি চাই। সার্থক হবে আমার মাতৃ জীবন।
