oplus_32

“অদৃষ্টের বিপত্তি”

author
2 minutes, 12 seconds Read

আবির আহমেদ তার কর্মচারী আশিককের সততা ও কর্মদক্ষতায় মুগ্ধ। তিনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন, আমার ব্যবসা-বাণিজ্যের দায়িত্ব আশিককে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারি। সে অত্যন্ত বিশ্বস্ত। স্ত্রী লায়লা আহমেদ শুনে বলেন, এই যুগে সৎ মানুষ পাওয়া সত্যিই কঠিন। আবির আহমেদ স্ত্রীর সঙ্গে আরো আলাপ করেন, আশিককে আমাদের জামাই করার কথা ভাবছি। তুমি কী বলো? যদি তোমার ভালো মনে হয় করো, আমার আপত্তি নেই, তবে রিপার মতামত নেওয়া উচিত। মেয়ে আমার সিদ্ধান্ত মেনে নেবে, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন আবির। কিন্তু আশিককের মতামতও জানা দরকার।
আবির আহমেদ মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে কথা বলেন, আশিককের সঙ্গে। আশিক বিনয়ের সঙ্গে উত্তর দেয়, আপনি আমার গুরুজন, আপনার সিদ্ধান্তই আমার জন্য মঙ্গল।
কিন্তু রিপা আশিককে বিয়ে করতে রাজি নয়। সে ভালোবাসে অনিককে। বাবা, আমি অনিককে ভালোবাসি। রিপার কণ্ঠ আবেগপ্রবণ। আবির আহমেদ অভিমানে বলেন, আমি তোমার ওপর আস্থা রেখেছিলাম, কিন্তু তুমি আমার সিদ্ধান্ত মানতে পারলে না! অথচ আশিক তো মেনে নিল। রিপা কান্নার সঙ্গে বলে, বাবা, আমি অনিককে চাই। ওর সঙ্গেই আমি সুখী হবো। বেয়াদব মেয়ে! বাবার সামনে এমন কথা বলতে লজ্জা লাগে না? কঠোর কণ্ঠে বলেন আবির। আমি যার সঙ্গে তোমার বিয়ে ঠিক করেছি, সে-ই তোমাকে সুখী করবে। বাবা, আমি যাকে আমার মন দিতে পারব না, তার সঙ্গে কীভাবে সুখী হবো? রিপার চোখ ছলছল করে ওঠে। আমার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। রিপা দৃঢ় কণ্ঠে বলল, বাবা, আমি আর কিছু চাইব না, শুধু আমার ভালোবাসার মানুষটিকে চাই। আমি যার সঙ্গে সুখী হবো না, তাকে নিয়ে জীবন কাটাব কীভাবে?
আবির আহমেদ বিস্মিত হয়ে বললেন, তোমার মন চায় বা না চায়, সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত! রিপা বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, আমার সুখের কথা ভেবে তুমি কি তোমার সিদ্ধান্ত বদলাতে পারবে না? তুমি তো চাও আমি সুখী হই। বাবা আমি সুখী হবো অনিককের সঙ্গে। আবির আহমেদ গভীর চিন্তায় পড়ে গেলেন। আমার বাড়ি-গাড়ি, টাকা-পয়সার কোনো অভাব নেই। তুমি আমার একমাত্র কন্যা, তোমার সুখই আমার কাম্য। আমি তোমার জন্য এমন একজনকে চাই, যে তোমায় ভালো রাখবে। বাবা, তুমি যদি আমার সুখ চাও, তবে দেখো আমি কিভাবে সুখী হতে পারি। রিপার চোখে দৃঢ়তা ফুটে ওঠে।
আবির আহমেদ আশিককে বললেন, বাবা, তুমি তোমার বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলো। তাদের মত নিয়েই তোমার আর রিপার বিয়ের কাজ সম্পন্ন করতে চাই। আশিক মাথা নেড়ে বলল, ঠিক আছে, আমি কথা বলব তাদের সঙ্গে।
oplus_32
দুই-এক দিন পর আশিক এসে জানাল, বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা হয়েছে, তারা আসতে পারবেন না। বয়স হয়েছে, এখন আর তেমন চলাচল করতে পারেন না। তবে তারা বলেছেন, তাদের দোয়া আমার সঙ্গে আছে। আর আপনি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেটাতেই তারা খুশি। আবির আহমেদ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন, যদি তারা আসতে পারতেন, তাহলে ভালো হতো। তবে তাদের মত আছে, এটা জেনে আমি আশ্বস্ত হলাম। আবির আহমেদ সন্তুষ্ট মেয়েকে তার পছন্দের পাত্রের হাতে তুলে পেরে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আশিককের জীবনযাপন বদলে যায়। এখন সে আর নিয়মিত অফিসে যায় না। একদিন রিপা বিরক্ত হয়ে বলল, এখনো তুমি ঘুমিয়ে আছো? অফিসে যাবে কখন? আমার অফিসে যাওয়ার দরকার নেই, অবহেলায় জবাব দিল আশিক। অফিসে যারা আছে, তারাই দেখাশোনা করবে। আমি তো এখন শ্বশুরের আদরের জামাই। আমার আর কিছু করার প্রয়োজন নেই। রিপার গলা কঠিন হয়ে উঠল, তোমার শ্বশুরের যা আছে, তা তার নিজের অর্জন। তোমার নিজের কী আছে? কিছু ভোগ করতে হলে আগে নিজে কষ্ট করে অর্জন করতে হয়। অন্যের উপার্জনে আরাম-আয়েশ করলে তা টেকে না। কী আশ্চর্য কথা বললে! হেসে বলল আশিক। সম্পর্কের মাধ্যমেই সবকিছু নিজের করে নিতে হয়। এটা আমি ভালোই জানি। কিন্তু আশিককের এই দায়িত্বহীন জীবনযাপন ধীরে ধীরে আবির আহমেদের দৃষ্টিগোচর হয়। একদিন তিনি আশিককে ডেকে বললেন, আশিক, তোমার কাছে আমার মেয়ে দিয়েছি কারণ আমি তোমার সততা আর দায়িত্ববোধ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। কিন্তু এখন যা দেখছি, তা একেবারেই আমার প্রত্যাশার বাইরে। আশিক ঠোঁট উল্টে বলল, তখন আমি আপনার অফিসের একজন সাধারণ কর্মচারী ছিলাম। আর এখন আমি আপনার জামাই। সময়ের সঙ্গে সম্পর্ক বদলায়। এখন আমার অবস্থান আলাদা। আবির আহমেদ আশিককের উত্তর শুনে হতবাক হয়ে গেলেন। না, আমার ব্যবসা-বাণিজ্য কোনোভাবেই তোমার হাতে ছাড়তে পারবো না। সবকিছু আমার নিজস্ব কর্তৃত্বে রাখতে হবে।
আশিক মদ্যপ অবস্থায় বাসায় ফিরেই প্রমত্ততা শুরু করে। ঘরের আসবাবপত্র ভাঙচুর করতে থাকে, আর এক পর্যায়ে রিপার কাছে টাকা দাবি করে। আমার টাকা চাই! চিৎকার করে বলে আশিক। রিপা ধৈর্যের সঙ্গে জবাব দেয়, আমার বাবা তোমাকে টাকা দিলেও আমি দিতে দেবো না!
কেন দেবে না? আশিক চোখ রাঙিয়ে বলে। আমি তোমাকে বিয়ে করেছি, এখন সবকিছুর মালিক আমি! আমি যখন যেভাবে খরচ করতে চাই, সেভাবে করবো!
আবির আহমেদের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙতে শুরু করে। আশিক, তুমি যদি এমনই হও, তাহলে আমার মেয়ের সঙ্গে সংসার করার কোনো অধিকার তোমার নেই! আপনার বাড়ি-গাড়ি, ব্যবসা-বাণিজ্য সবকিছু আমার নামে লিখে দিন, ধৃষ্টতার সঙ্গে দাবি করে আশিক। আমি তোমার নামে কিছুই লিখে দেবো না। বরং আমি আমার মেয়েকে তোমাকে ডিভোর্স দিতে বলবো! আশিক হতভম্ব হয়ে যায়। যদি রিপা ডিভোর্স দেয়, তাহলে সবকিছু হাতছাড়া হয়ে যাবে! কিন্তু রিপা বাবার দিকে তাকিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলে, বাবা, কেন এখন ডিভোর্স দিতে বলছো? তুমি তো বলেছিলে সে ভালো ছেলে! তার কর্মকাণ্ড সবকিছুই মুখোশের আড়ালে ছিল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন আবির আহমেদ, আমি ওকে চিনতে পারিনি! এখন চিনে লাভ কি, বাবা? রিপা হতাশভাবে বলে। আমি তাকে ডিভোর্স দেবো না!
আবির আহমেদ কঠিন কণ্ঠে বলেন, কেন দেবে না? সে তো ভালো ছেলে নয়!
রিপা হতাশ হয়ে বাবাকে বলল, তুমি বললে বিয়ে করতে, আমি করেছি। এখন তুমি বলছো ডিভোর্স দিতে, আমি কি তাও করে ফেলবো?
আবির আহমেদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, হ্যাঁ মা, আমি চাই তুমি সুখী হও। আমি তো ওরে ভালো ছেলে ভেবে তোমাকে বিয়ে দিয়েছিলাম। রিপার চোখে অভিমান জমে ওঠে, বাবা, সে ভালো ছেলে। তুমি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলে, সে জন্য আমি আমার ভালোবাসার মানুষকে হারিয়েছি। মা, সেদিন যা করেছিলাম, তোমার সুখের জন্যই করেছিলাম। আজও যা করতে চাই, সেটাও তোমার সুখের জন্য।
রিপার কণ্ঠ কাঁপছিল, বাবা, সুখ! সুখ! সুখ! তুমি সুখের কথা বলো না। আমি পারতাম সেদিন পালিয়ে গিয়ে আমার ভালোবাসার মানুষকে বিয়ে করতে, কিন্তু করিনি! তোমার দিকে তাকিয়ে আমি নিজের সুখ বিসর্জন দিয়েছি। আজ কেন তুমি আমার ডিভোর্স চাইছো? আবির আহমেদ মেয়ে রিপার দিকে তাকিয়ে চুপ হয়ে যান।
এখন রিপা দুই সন্তানের মা। কিন্তু আশিক বাবা হয়েও সংসারের কোনো দায়িত্ব নেয় না। সে দিনের পর দিন মাতাল হয়ে পড়ে থাকে, সংসার বা সন্তান দেখার কোনো প্রয়োজন মনে করে না। একদিন, আশিক রিপাকে বলল, তোর মধ্যে তোর বাবার জীবন। তুই যদি বাড়ি, ফ্ল্যাট আমার নামে লিখে দিতে বলিস, তোর বাবা তাই করবে। আমি কিছুই তোমার নামে লিখে দিতে বাবাকে বলবো না! দৃঢ় কণ্ঠে বলল রিপা।
তাহলে সংসার করবো না! রাগে বলল আশিক।
সংসার করবে না, না করো! ঠান্ডা গলায় জবাব দিল রিপা। আশিক দিনে দিনে রিপার ওপর অত্যাচার বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু তবুও, রিপা বাবার সম্পত্তি আশিকের নামে লিখে দিতে রাজি হয়নি।
একদিন একটি বয়স্ক মহিলা এসে হাজির হয় রিপার বাসায়। রিপা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, আপনি কাকে চান? আমি আমার স্বামীর খোঁজে এসেছি, সে শান্ত কণ্ঠে বললেন।
রিপা বিস্মিত হয়ে বলল, আপনার স্বামী কে?
আশিক! সামা বলে। রিপা হতভম্ব হয়ে গেল। সামা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, আমি এক সন্তানের মা। আশিক আমাকে বিয়ে করেছিল যৌতুকের লোভে। আমি ছিলাম বিধবা, বাবা-মা সন্তান আর আমার ভবিষ্যতের কথা ভেবে আমাকে আশিককের সঙ্গে বিয়ে দেন। কিন্তু আশিক টাকা-পয়সা খরচ করে ঢাকা শহরে চলে আসে। তারপর আর আমার কোনো খোঁজ নেয়নি, আমিও তার কোনো সন্ধান পাইনি। কিন্তু এখন আমি তার খবর পেয়ে, চলে এলাম। সামা আশিককের দিকে তাকিয়ে বলে, তুমি এখানে নতুন সংসার গড়ে তুললে, কিন্তু একবারও আমার কথা ভাবো নেই? আশিক চুপ। কোনো উত্তর নেই।
রিপা বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, বাবা, দেখো! এই ছেলের আসল রূপ। যার আগে থেকেই বউ ছিল, সেই ছেলেকে তুমি আমার জীবনসঙ্গী বানিয়ে দিলে! আবির আহমেদ স্তব্ধ হয়ে গেলেন। আমি ভাবতাম, সে সৎ ও সরল। কিন্তু মুখোশ খুলে বেরিয়ে এল তার আসল রূপ! রিপা শান্তভাবে বলল, বাবা, তুমি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলে, আমি তা মেনে নিয়েছি। কিন্তু আমি এই সংসার ছেড়বো না, কারণ এটাই আমার ভাগ্য। যা আমার ভাগ্যে আছে, তাই-ই হবে। রিপা কিছুক্ষণ নীরবতা থেকে বলে, সৌন্দর্য, শিক্ষা, অর্থ সবই তো ছিল, সবকিছু থাকা সত্ত্বেও, আমি সুখী নই। সুখ এমন একটা জিনিস চাইলেই তাকে ধরা যায় না।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *