
আজ ঈদ। চারপাশ আনন্দে মেতে উঠেছে, ঈদ উদযাপনের ব্যস্ততা ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। আমি কিছু ভেজা কাপড় নিয়ে বারান্দায় গেলাম, রশিতে কাপড় মেলে দিতে, আচমকা শুনতে পেলাম, খালাম্মা, মাংস দিবেন? নিচের দিকে তাকানোর আগেই আমার পোষা কবুতর এসে কাঁধে লাফালাফি শুরু করল। বিশেষ করে একটি কবুতর, যাকে আদর না করলে অভিমান করে বসে থাকে। ব্যস্ত থাকলে নিজেই এসে কাঁধে বসে পড়ে, তারপর তার স্বভাবসুলভ বাক বাকুম ডাকতে থাকে। কিন্তু আবার শুনতে পেলাম সেই কণ্ঠ, খালাম্মা, মাংস দিবেন? কবুতরটিকে সরিয়ে নিচে তাকালাম। বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেলাম। একটি ছোট্ট মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কী অপরূপ তার চেহারা! তার চোখ, তার মুখ, সবকিছু যেন কথা বলছে। বয়স দশ-এগারো হবে। এতটুকু শিশুটি মাংসের জন্য ডাকছে, আহা এই বয়সে দ্বারে দ্বারে ঘুরছে! এই দৃশ্য আমাকে স্তব্ধ করে দিলো। আমি তাকে ডাকবো, তাকে মাংস দেবো, এসব ভাবার আগেই আমি বিস্ময়ে হারিয়ে গেলাম। কেন এত ছোট একটি মেয়ে মাংসের জন্য ঘুরতে বাধ্য হবে? উপর থেকে কয়েক টুকরো মাংস পলিথিনে নিচে পড়ল। পলিথিন ছিঁড়ে মাংসগুলো ছড়িয়ে পড়ল কাদায়। সাধারণত রাস্তা মোটামুটি পরিষ্কার থাকে, কিন্তু আজ নয়। কোরবানির পশু রাখা হয়েছিল, তার আবর্জনা ছড়িয়ে আছে। বৃষ্টির পানি মাটির সঙ্গে মিশে কাদায় পরিণত হয়েছে, আর সেই কাদার ভেতরেই মাংস ঢুকে গেল।
হঠাৎ মেয়েটি আমার দিকে তাকায়। ওর চোখে চোখ পড়তেই আমার মনে হলো, ও ভীষণ লজ্জা পেয়েছে। কিন্তু আমি লজ্জা পাইনি, বরং বুকের গভীরে এক ধরনের মায়া জন্ম নিল। কেন এত ছোট একটা শিশু মাংস চাইতে বের হলো! এই ভাবনাই আমাকে অজান্তে আবেগাপ্লুত করে তুলল। ও যখন মাটি থেকে কুড়িয়ে তোলে মাংস, ঠিক তখনই ওর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধা করুণ স্বরে বলে উঠল, খালাম্মা, আমারে মাংস দিবেন না?
উপর থেকে একজন উত্তর দিলেন, মাংস তো দিয়েছি, ওইটাই ভাগ করে নাও।

ছোট শিশুটি কাদামাখা মাংসের তিন টুকরার মধ্যে এক টুকরা নিজের ব্যাগে রেখে, ছোট্ট হাতে বাকি দুই টুকরো তুলে দিল বৃদ্ধার দিকে। বৃদ্ধ তখন অনুভব করল, শিশুটি বয়সে ছোট হলেও, তার মন বিশাল। নিজের জন্য এক টুকরা রেখে বাকি দুটি বিনা দ্বিধায় এগিয়ে দিলো। বৃদ্ধ কাঁপা গলায় বলল, আমার লাগবে না, মা।
আমি কিছু না বলে, তড়িঘড়ি করে ভিতরে চলে এলাম, শিশুটির জন্য খাবার নিয়ে আসতেই, ফিরে দেখি, ও নেই। তখন মনটা কান্নায় ভেঙে পড়ল ওর জন্য। কেন জানি মনে হলো, এখনই যদি ওর দেখা পেতাম! সেই মায়াভরা মুখখানি বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল।
কোরবানির দিনটা পেরিয়ে গেল। কিন্তু শিশুটিকে ভুলতে পারিনি। তার ছোট্ট হাতে মাংস এগিয়ে দেওয়ার দৃশ্যটি আত্মত্যাগের অভূতপূর্ব মহিমায় উদ্ভাসিত হলো। গেঁথে রইলো মনের গভীরে অমলিন হয়ে। পৃথিবী থেকে দারিদ্র্য দূর হোক। প্রতিটি শিশুর ভাগ্য হোক প্রসন্ন। তাদের যেন দু টুকরো মাংসের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াতে না হয়। সবার ঘরে যেন কোরবানি দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করে দেন বিধাতা।
