“গোপন ভিডিও এবং নারীর প্যারালাইজড জীবন”

author
0 minutes, 12 seconds Read

গোপন ভিডিও এবং নারীর প্যারালাইজড জীবন 

সুলেখা আক্তার শান্তা

 

ধর্ষণের মতো আরও একটি ব্যাধি নীরব ঘাতক হয়ে নারীর মনোজগত কুরে কুরে খাচ্ছে। ধর্ষণের মতো নারীর প্রতি এই নিষ্ঠুর নৃশংসতা আমাদের নারী জীবনকে মানসিক বৈকল্যের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়েছে। দ্রুত রাষ্ট্রীয় সক্রিয়তায় এই ব্যাধি নিরসনে সক্রিয় ব্যবস্থা গ্রহন জরুরী। নারীর প্রতি পুরুষের নৃশংসতার নতুন হাতিয়ার হয়ে উঠেছে ক্যামেরা তথা মোবাইল ফোন। এআই দিয়েছে এই ব্যাধিতে ভয়াবহ পূর্ণতা। মোবাইল ফোনের ক্যামেরা এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিগত সহজলভ্যতা ক্রমাগত নারীর জীবনে বিভীষিকা হয়ে দেখা দিয়েছে। নারীর গোপন ভিডিও ধারণের ঘৃণ্য নৈপুণ্য এবং তা প্রকাশের হুমকি বিস্তার লাভ করছে সর্বত্র। একশ্রেণীর অবিবেচক মানুষ মেতে উঠেছে পৈশাচিক উন্মত্ততায়। লক্ষ লক্ষ নারীর জীবন বন্দী হয়ে আছে পুরুষের মোবাইল ক্যামেরায়। নারীর অসতর্ক মুহূর্ত ক্যামেরায় ধারণ করে জিম্মি করে রাখা হচ্ছে নারীকে। কৌশলে ধারণ করা এই ভিডিওর কারণে লক্ষ লক্ষ নারীকে প্রতিমুহূর্তে ধুকে-ধুকে পার করতে হচ্ছে অব্যক্ত দুর্বিষহ জীবন। লোক চক্ষুর অন্তরালে নিষ্ঠুর ভাবে তাদের পদানত করে রাখা হয়েছে। দিনের পর দিন তাদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করা হচ্ছে অবাঞ্ছিত দাবির কাছে। এ যেন জীবন্ত লাশ হয়ে বেঁচে থাকার মতো। তথাকথিত লোক লজ্জার ভয়ংকর তাড়নায় কাউকে হয়তো আসল লাশে পরিণত হতে হচ্ছে আত্মহত্যা করে। স্বেচ্ছায় একজন নারী আপত্তিকর ভিডিও করার মানসিকতা ধারণ করে না। প্রধানত বিকারগ্রস্ত পুরুষের কুট কৌশলেই নারীর বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য তৈরি হয় ভিডিও মারণাস্ত্র গুলো। গোপন ধারণ করা ভিডিওর কারণে সমাজে নারী জনসংখ্যার বৃহৎ অংশ প্যারালাইজড হয়ে আছে সবার অলক্ষ্যে। অপমান ক্ষোভ আর অভিমানে নিরবে দগ্ধ হয়ে সমাজ সংসারে রাখতে পারছে না সক্রিয় ভূমিকা। অপরাধ না করেও অপরাধী হবার অভিশপ্ত চক্রের মধ্যে বন্দী তারা। প্রকাশ্যে স্বাভাবিক থাকলেও প্রতিমুহূর্তের ভয় ও শঙ্কা তাদের এক অস্বাভাবিক জীবন যাপনে বাধ্য হতে হচ্ছে। অসতর্ক ভিডিও ধারণ নারীর প্রতি সহিংসতার একটি অন্যতম প্রকাশিত অপরাধ। প্রতিদিন এই অপরাধের সংখ্যা বেড়ে চলেছে গুণিতক হারে।‌ পুরুষের ক্ষেত্রেও ভিডিও ধারণের রয়েছে সীমাহীন বিড়ম্বনার ঘটনা। অনিচ্ছায় কিংবা হানি ট্র্যাপ এর শিকার হয়ে অনেককে যাপন করতে হচ্ছে দুর্বিষহ ব্ল্যাকমেইলিং এর রুদ্ধ জীবন। বেঁচে থাকতে হচ্ছে জীবন্ত লাশর মতো প্রতিনিয়ত মৃত্যুর যন্ত্রণা নিয়ে। এর মধ্যে প্রযুক্তির সৃষ্টি করা আরেক যন্ত্রণা তো রয়েছে। এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে হুবহু যে কারো ভিডিও তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। এগুলো এতই নিখুঁত যে সাধারণ মানুষের পক্ষে সেটার অবাস্তব পার্থক্য বুঝে ওঠা কঠিন। ব্ল্যাকমেইলিং এর জন্য এসব ব্যবহৃত হচ্ছে। গোপন বিষয় বিধায় প্রকাশ্যে এসবের আলোচনা খুব কমই হয়। এই অপকর্মের সঙ্গে উৎসমুখে জড়িতদের খুঁজে বের করা এখন আর কঠিন কোন বিষয় নয়। যতই ফেক আইডিতে অথবা যতবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রচার করা হোক না কেন প্রযুক্তির কল্যাণে মূল উদ্ভাবক কে খুঁজে বের করা মুহূর্তের কাজ। প্রয়োজন আইন সদিচ্ছা এবং উদ্যোগ। ধর্ষণের মতো ভিডিও অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠিন শাস্তির বিধানে রক্ষা করা যেতে পারে বিরাট সংখ্যকের জীবন। অপরদিকে জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ভুক্তভোগীকে অপরাধী এবং লজ্জিত হবার কালচার থেকে বের করে আনা যেতে পারে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সহানুভূতি ও সহমর্মিতা দিয়ে। নারীকে আত্মহন বা আত্মসমর্পণের এর পথে না গিয়ে শেখাতে হবে চ্যালেঞ্জ করে ঘুরে দাঁড়াতে। চক্ষু লজ্জার অদৃশ্য বাঁধনে আষ্টেপিষ্টে তাদের বেঁধে না রেখে সহমর্মিতায় নিশ্চিত করতে হবে স্বাভাবিক জীবন যাপন। এদের বাধা গ্রস্থ জীবনের কারণে সমাজ সংসার পারিবারিক জীবনের বলিষ্ঠ বিকাশ সম্ভব হবে না। প্রতিকারের জন্য আইন বিচারের দ্বারস্থ না হয়ে অসহায় মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণের রেওয়াজ জাতির বিবেক কে কেন বিক্ষত করে না? ‘ধর্ষণের বিচার চাইতে গেলে বিচার প্রার্থীকে আরো একবার ধর্ষিত হবার মতো পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়।’ কথাটি শোভনীয় নয়, নারীর বিচার প্রার্থনার ক্ষেত্রে বহু ঘাত প্রতিঘাতে এমন কথা হয়তো প্রচলিত হতে পারে। সভ্য জাতির ক্ষেত্রে এমন অপবাদ অবশ্যই মোচনীয় হওয়া বাঞ্ছনীয়। হে মানুষ তোমরা যাদের অপমানিত লাঞ্ছিত করছো তারা আমাদেরই গর্ভধারিনী মা বোন স্ত্রী, কন্যা, আমাদের আত্মজ আমাদের আপন জন।

 

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *