
সুজন বিয়ে করে বউ নিয়ে বাড়িতে আসে। মা শেফালী আর বোন জলি তাকে দেখে অবাক।
শেফালী কড়া গলায় বলে, তোর সঙ্গে কে এই মেয়েটা?
সুজন বলে, মা, এনা। আমি ওকে বিয়ে করেছি। ও তোমাদের ছেলের বউ।
শেফালী কপাল কুঁচকে বলল, আমার ছেলের বউ তো আমি নিজের পছন্দে আনবো। আর তুই যাকে এনেছিস, সে তো আমার ছেলের বউ নয়।
সুজন মাকে অনুনয় করে বলে, মা, বিয়ে জীবনে একবারই হয়। আমি সেটা করে ফেলেছি। আমি একা বিয়ে করেছি বলে হয়তো তোমার কষ্ট হয়েছে। মা, সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে কষ্ট ভুলে গিয়ে এনাকে পুত্রবধূ হিসেবে মেনে নাও।
শেফালী রেগে উঠে বলে, তুই কি আমাকে জন্ম দিয়েছিস, না আমি তোকে জন্ম দিয়েছি? হুকুম মানতে হলে আমারটাই মানতে হবে। আমি মা! তুই তোর বউ নিয়ে বের হয়ে যা। এই বিষয় নিয়ে যেন আমাকে আর একবারও কথা বলতে না হয়। জোড় গলায় বলে জলি, হ্যাঁ তুমি তোমার বউ নিয়ে বের হয়ে যাও।
সুজন বলে, তুই চুপ থাক! জলি বলে, আমাকে ধমক দিয়ে কথা বলছ? দেখি, তোমার বউ এই বাড়িতে কী করে থাকে!
সুজন বলে, ঠিক আছে মা, আমি এনাকে নিয়ে চলে যাচ্ছি। যেখানে এনার কদর নেই, সেখানে আমি ও থাকতে চাই না। এনা, চলো। এনা শান্ত গলায় বলে, না, আমি এখান থেকে যাব না। তুমি মায়ের ওপর রাগ করো না। মা রাগ করে যা-ই বলুক, সে তো মা। কারণ সন্তান কে নিয়ে তার অনেক আশা-ভরসা থাকে। সে নিজের পছন্দ মতো ছেলে, মেয়ের বিয়ে দিতে চায়—এটা সব বাবা, মায়েরই ইচ্ছে। একটু থেমে এনা বলে, আমি চাই মায়ের সেবা-যত্ন করতে, ভালোবাসা দিয়ে মায়ের মন জয় করতে।
সুজন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ঠিক আছে, দেখি তুমি পারো কিনা।

শেফালী ছেলেকে ডাকে, সুজন, এদিকে আয়।
মা, ডেকেছো?
কী, আমার গলার আওয়াজ কি তোর কানে যায় না? সুজন চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।
দাঁড়িয়ে আছিস কেন? পাশে বস। শোন, এই তিনতলা বাড়ি বানাতে কত কষ্ট করেছি জানিস? আমি ঢাকাশহরের বাড়ির মালিক। যার বাড়ি আছে, আমি তো তার সঙ্গেই আত্মীয় করব। আমার চোখের সামনে কত কত বাড়ি! এখান থেকেই তো কোনো বাড়িওয়ালার মেয়ে পছন্দ করে ছেলের জন্য আনতে পারতাম। একটু থেমে কঠিন গলায় বলে, তুই আমার আশা-ভরসা সব ভেঙে দিলি! এখন চাই, সামনে যেন আমার কথার অবাধ্য না হস। এই মেয়েটাকে বিদায় করতে যত টাকা লাগে, আমি দেব। সে নিয়ে তোর কোনো চিন্তা করতে হবে না। তুই শুধু ওকে তোর হৃদয় থেকে ঝেড়ে ফেল।
সুজন শান্ত গলায় বলে, মা, তুমি আমার মা।
শেফালী কটাক্ষ করে বলে, কী, সন্দেহ আছে নাকি আমি তোর মা না?
মা, আমি কোনো অবস্থাতেই এনাকে আমার জীবন থেকে বিদায় করব না।
শেফালী উত্তেজিত হয়ে বলে, তুই কি আমাকে কাঁদাবি? আমাকে কাঁদাবি?
সুজন চোখ নামিয়ে বলে, মা, আমি তোমাকে কখনোই কাঁদাতে চাই না। এই একটা বিষয় ছাড়া তুমি দেখো—তোমার কোনো হুকুম আমি কখনো অমান্য করেছি কি না। তা ছাড়া তুমি যা বলবে, আমি সবই মেনে নেব, তোমার সব আবদার।
হঠাৎ জোরে থালা-বাসনের শব্দ হয়।
কী হলো? কী হলো? বলে, শেফালী রুম থেকে বেরিয়ে আসে।
জলি তৎক্ষণাৎ বলে মা, দেখো না! এই ফকিন্নির বাচ্চা কতগুলো কাছের প্লেট ভেঙে ফেলেছে!
এনা চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।
শেফালী ক্ষোভে বলে, হায় আল্লাহ! আমার এতগুলো দামি প্লেট ভেঙে ফেলল!
জলি ফিসফিস করে এনাকে বলে, একটু শব্দও করিস না। করলে কিন্তু এই বাড়িতে থাকা মুশকিল হবে। শেফালী কড়া গলায় বলে এনাকে, আমার চোখের সামনে থেকে দূর হয়ে যা।
এই কথা শুনে এনা রান্নাঘরের দিকে চলে যায়।
সুজন কাছে এসে জিজ্ঞেস করে, কী হয়েছিল? তোমার হাতে প্লেট ভাঙল কীভাবে? এনা ধীরে বলে, আমার হাতে কিছুই ভাঙেনি। ইচ্ছে করে জলি ভেঙেছে। জলি ভেঙেছে? তাহলে তুমি কিছু বললে না কেন?
এনা চোখ নামিয়ে বলে, ভাবলাম, যা-ই করুক, আমার নাম দেক। আমি মনে করি, একদিন এই রাগ আমার ওপর থেকে শেষ হয়ে যাবে। তাই আমাকে সহনশীল হতে হবে। একটু থেমে এনা বলে, স্বামী হিসেবে আমি তোমার কাছে দোয়া চাই—আমার ধৈর্যের শক্তিতে যেন একদিন তোমার পরিবারের শান্তি ফিরে আসে।
শেফালী কবিরাজের কাছে যায়। সেখানে গিয়ে কঠোর গলায় বলে, যে কোনো মূল্যেই হোক, একটা কাজ আপনাকে করতেই হবে। আমার ছেলের বউকে আমার সংসার থেকে তাড়াতে হবে। আমি কিছুতেই ওকে সহ্য করতে পারি না।
কবিরাজ জোবায়েদ নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে বলে, আপা, আপনি এ নিয়ে কোনো চিন্তা করবেন না। এই মেয়ে বেশিদিন আপনার সংসারে টিকবে না। ও নিজে থেকেই চলে যাবে। এমন ব্যবস্থা করব, আপনার ছেলে ওকে আর সহ্য করতে পারবে না।
শেফালী দাঁত চেপে বলে, এমন কাজ করবেন যাতে আমার পরাণটা ঠান্ডা হয়। আমার পরাণ ঠান্ডা হলে, আপনার পরাণও আমি ঠান্ডা করে দেব। টাকা-পয়সা নিয়ে কোনো চিন্তা করবেন না।
কবিরাজ বলে, এই যে পানি পড়া দিলাম, এটা ঘরের চারদিকে ছিটিয়ে দেবেন। আর এই তাবিজটা ঘরের দরজায় বেঁধে দেবেন। কিছু জিনিস দিলাম—এগুলো ওকে খাওয়াতে হবে। সপ্তাহখানেকের মধ্যেই দেখবেন কাজ শুরু হয়ে যাবে।
ঠিক আছে, তাই যেন হয়। আর একটা কাজ করবেন—আমার মেয়েটার বিয়ের ব্যবস্থা করে দেবেন, যেন ভালো পাত্র পাই।
ঠিক আছে আপা, সব ব্যবস্থা করে দেব। এই নিন, মেয়ের জন্য তাবিজ। এগুলো মেয়েরে খাওয়াবেন, আর বালিশের ভেতরে এই তাবিজগুলো রেখে দেবেন।
শেফালী উঠে দাঁড়ায়। ঠিক আছে, আমি এখন যাই। তবে আগে দরকার ওই মেয়েটাকে তাড়ানো। আমি ওকে একদমই সহ্য করতে পারি না।
কবিরাজ আশ্বাস দেয়, আপা, আপনার কাজ হয়ে যাবে। আমার ওপর বিশ্বাস রাখুন। কাজ হওয়াই তো আসল কথা।
শেফালী কঠিন স্বরে বলে, আপনার কাজে বিশ্বাস আছে বলেই আপনার কাছে এসেছি। নইলে তো আরও কত কবিরাজ আছে! তাদের ওইখানে যাইতাম।
শেফালী বাড়ি ফিরে আসে। কবিরাজ যে তাবিজ-কবজ আর নিয়ম বলে দিয়েছিল, সে ঠিক সেভাবেই সব করতে শুরু করে। সবাই টেবিলে বসে ভাত খাচ্ছিল। হঠাৎ শেফালী ছেলের মগে থাকা পানি ঢেলে দিয়ে, নিজে পানি ঢেলে দেয়। নে, আমি পানি দিচ্ছি। এটা খা।
সুজন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, মা, এটা কিসের পানি? ভালো পানি। ওই ফকিন্নির বাচ্চা পানি ফুটিয়েছে কি না, সে নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। তাই তোকে ফ্রেশ পানি দিলাম। খা।
রাতে সুজন ঘুমাতে যায়। বালিশে হাত দিতেই সে আঁতকে ওঠে। বালিশের ভেতরে অনেকগুলো তাবিজ! এ কিসের তাবিজ? সে এনাকে জিজ্ঞেস করে, এনা, তুমি বালিশের ভেতরে তাবিজ রেখেছ?
এনা বিস্মিত হয়ে বলে, না, আমি কোনো তাবিজ রাখিনি। মাকে জিজ্ঞেস করো—তিনি রেখেছেন কি না।
সুজন মাকে ডাকে, মা! শেফালী ছেলের ডাকে কাছে আসে। কী হয়েছে? ডাকছিস কেন?
মা, বালিশের ভেতরে তাবিজ!
শেফালী হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে, হায়, হায়, হায়! ওই ফকিন্নির বাচ্চা আমার ছেলেকে তাবিজ করছে!
এনা কাঁপা গলায় বলে, মা, আমি তাবিজ পাব কোথায়? আমি তো কখনো বাসার বাইরে যাইনি। এখানকার রাস্তাঘাটও আমি চিনি না।
শেফালী তেড়ে বলে, দেখছিস! ফকিন্নির বাচ্চা আবার কথা কয়!
সুজন কষ্ট নিয়ে বলে, মা, তুমি সব সময় “ফকিন্নির বাচ্চা” বলো কেন? ওর তো একটা নাম আছে। নাম ধরে ডাকো।
শেফালী বলে, ফকিন্নির বাচ্চারে ফকিন্নির বাচ্চা বলব না তো কী বলব? একটু থেমে ঠান্ডা গলায় বলে, ঠিক আছে, এবার হলো তো? এই তাবিজ আমি রেখেছিলাম। এখন সবাই ঠান্ডা থাক।
সুজন মার্কেটে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়। এনাকে জিজ্ঞেস করে — তোমার কী দরকার? বলো, আমি নিয়ে আসব।
এনা হালকা হাসি দিয়ে বলে, না, আমার কিছু দরকার নেই।
বলো না, কী লাগবে?
এনা মৃদু গলায় বলে, আমার কিচ্ছু লাগবে না। লাগবে শুধু তোমাকে।
সুজন হেসে ওঠে, ওরে আমার আল্লাহ! বউ আমার বউ বলে কী! ঠিক আছে, আমি আমার পছন্দ মতো জিনিস কিনে নিয়ে আসব।
আমার সত্যিই কিছু লাগবে না। তুমি আমার অলংকার। তুমি থাকলেই হবে।
সুজন আবেগে বলে, আমি তোমার আছি, তোমারই থাকব। আমি যদি বেঁচে থাকি, সুস্থ থাকি, পাগল না হয়ে যাই—তাহলে কোনো শক্তিই আমাকে তোমার থেকে আলাদা করতে পারবে না।
এনা চোখ ভিজিয়ে বলে, মরার পরও যদি চেতনা জাগে, সেই চেতনাতেও থাকবে তুমি।
সুজন বলে, আমারও তাই।
ঠিক আছে, আমি তাহলে মার্কেটে যাই।
এই কথাগুলো আড়াল থেকে শুনছিল জলি। সে ছুটে গিয়ে মায়ের কানে বিষ ঢালে। মা, নাও, তোমার সব শেষ! তোমার ছেলে উড়ে এসে জুড়ে বসা মেয়ের সঙ্গে এমন জড়িয়ে গেছে যে মরার পরও যদি চেতনা থাকে, সেখানে নাকি দু’জনের হৃদয়ে দু’জন থাকবে।
শেফালী ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। কী বলিস? আমার রাগ মাথায় উঠে গেছে!
জলি ঠান্ডা গলায় বলে, রাগ উঠিয়ে লাভ নেই, মা। ভাবো—কিভাবে কী করা যায়।
শেফালী দাঁত চেপে বলে, দেখি। আমি তো বলছি, ওকে সংসারে রাখব না, রাখব না।
সুজন মার্কেট থেকে ফিরে আসে। এনার জন্য অনেক কিছু নিয়ে এসেছে।
এনা অবাক হয়ে বলে, তুমি এত সব আনছো কেন আমার জন্য? আমি তো এসব কিছুই চাই না। চাই শুধু তোমাকে, শুধুই তোমাকে।
সুজন হেসে বলে, আমাকে চাও, বেশ ভালো কথা। কিন্তু তার সঙ্গে তো এসবও লাগে। আজ তুমি সুন্দর করে সেজে আসো। আমি দুই নয়ন ভরে তোমাকে দেখব—শুধুই তোমাকে।
এনা লাজুক হাসি নিয়ে সাজতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ পর এনা সেজে সুজনের সামনে দাঁড়ায়।
সুজন তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে বলে, মাশাল্লাহ! আমি এত সুন্দর বউ পেয়েছি। আল্লাহর রহমত।
এনা মৃদু গলায় বলে, আর আমি তোমার মতো স্বামী পেয়েছি।
এই দৃশ্যটা দূর থেকে দেখে শেফালীর গা জ্বলে ওঠে। না! আমি কী চাই আর কী হয়! এরে আমি সংসার করতে দেব না, দেব না, দেব না! রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সে আবার কবিরাজের কাছে যায়।
কবিরাজ জোবায়েদের সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ওঠে, আপনি কী কাজ করছেন? আপনার কোনো কাজই তো হচ্ছে না! ওদের সম্পর্ক তো আরও গভীর হচ্ছে!
কবিরাজ শান্ত স্বরে বলে, আপা, আপনি রাগ করবেন না। আমি আছি। আপনি তো চান এই মেয়ে আপনার সংসারে না থাকুক।
শেফালী তীব্র গলায় বলে, আপনার কথা আর আমি শুনতে চাই না। যেখানে কাজ হয় না, সেখানে কথা শুনে কী লাভ? এই কথা বলে, শেফালী কবিরাজের বাড়ি থেকে রাগে গজগজ করতে করতে বেরিয়ে যায়।

বাড়ি ফিরে শেফালী এনাকে ডাকে। কাছে এসো।
এনা কাছে আসে। মা, কিছু লাগবে আপনার?
না, কিছু লাগবে না। আমার রাগটাই তুমি দেখলে, আমারে চিনতে পারলে না?
এনা শান্ত গলায় বলে, মা, আমি চিনেছি। আপনি আমার শাশুড়ি।
শাশুড়ি বলো না, মা বলবে।
ঠিক আছে, মা। শাশুড়ির এই হঠাৎ পরিবর্তনে এনার মনে অজানা আতঙ্ক জাগে। যে মানুষটা তাকে দেখতে পারত না, সে হঠাৎ এত আপন হয়ে যাচ্ছে—কেন?
শেফালী ধীরে বলে, শোনো এনা, আমি শুধু তোমাকে তাড়াতেই চাইছিলাম। কিন্তু বুঝলাম, তোমার জায়গায় অন্য কেউ তো আসবে। কেউ না কেউ আসবেই। তোমাকে তাড়িয়ে দিয়ে লাভ কী? যে আসবে, সে যদি আমার কথা না শোনে, আমাকে সম্মান না করে? তুমি আমাকে মান্য করো, ভয় পাও। তাই ভেবেছি—আমার ছেলের বউ যদি কেউ হয়, সে তুমি-ই হও।
এনার চোখ ভিজে ওঠে। মা, আমার কী যে ভালো লাগছে! আপনি আমাকে মেনে নিয়েছেন। সে আবেগভরা গলায় বলে, তবে মা, সব বাবা-মায়েরই ইচ্ছে থাকে—ছেলে-মেয়ের বিয়ে নিজের পছন্দমতো করাবে। আপনার এই কষ্ট আমি আমার ভালোবাসা দিয়ে মুছে দিতে চাই।
সুজন বিছানায় শুয়ে দেখে, এনা বিছনায় নেই। মনে মনে ভাবে, এনা হয়তো ভোরে উঠে সংসারের কাজে লেগে গেছে।
যখন ঘড়িতে সকাল দশটা বেজে যায়। সুজন অবাক হয়ে ভাবে, আমি এখনও বিছানায় পড়ে আছি, এনা আমাকে ডাকছে না কেন? না, উঠে পড়ি।
সুজন উঠে ডাকে, এনা… এনা…। কিন্তু কোনো সাড়া নেই। বাড়িটা অদ্ভুতভাবে নিস্তব্ধ। সে মায়ের ঘরে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, মা, এনা কই?
শেফালী উদাস গলায় বলে, কী জানি! আমি তো বলতে পারি না। আমাকেও তো চা-নাস্তা দেয়নি। বাথরুমে আছে কিনা দেখ। মা, আমি সব জায়গায় দেখেছি। কোথাও এনাকে পাচ্ছি না।
ঠিক তখনই কলিং বেল বেজে ওঠে। সুজন দরজা খুলে দেখে, পাশের বাড়ির এক মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে ভাঙা গলায় কাঁপতে কাঁপতে বলে, ভাইয়া… দহির রোডে ভাবির লাশ পড়ে আছে! সেখানে অনেক মানুষের ভিড়!
সুজন কোনো কথা বলতে পারে না। স্তব্ধ হয়ে যায়। ভাইয়া, কিছু বলছেন না কেন? তাড়াতাড়ি আসুন!
সুজন ছুটে যায়। ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে এনা। এনা! এনা! সে আত্মচিৎকার করে ওঠে। এ তো ছিল না কথা… তুমি আমাকে কেন এভাবে ছেড়ে গেলে? এনার শরীরে কামড়ের দাগ। আর পেটে—নিষ্ঠুর ছুরিকাঘাত।
এনার দাফন-কাফনের কাজ শেষ হয়। সুজন শূন্য মনে বাড়িতে ফিরে আসে। সুজন মায়ের সামনে দাঁড়ায়। কিন্তু দৃঢ় কাঁপা গলায় বলে, সন্তানের আশীর্বাদ বাবা-মা। বাবা-মায়ের দোয়াতেই সন্তান সাফল্যের মুখ দেখে। একটু থেমে সে বলে, কিন্তু বাবা-মা যখন সন্তানকে অভিশাপ দেয়, তখন সেই সন্তান ধ্বংস হয়ে যায়।
সুজনের চোখে আগুন জ্বলে ওঠে। আজ আমি তোমার কোনো দোয়া চাই না, মা। আজ আমি তোমার কোনো কিছুরই পরোয়া করি না। সুজন ভারী কণ্ঠে বলে, আমি তোমাকে অভিশাপ দিচ্ছি। তোমার সন্তান হয়ে। তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে। ধ্বংস হয়ে যাবে! আমার সুখ তোমার সইল না।
শেফালী অসুস্থ হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে শয্যাশায়ী হয়ে যায় সে। খাওয়া-দাওয়া প্রায় বন্ধ। সেবা করার মতো কেউ নেই। মেয়ে জলির বিয়ে হয়ে গেছে, সে থাকে তার শ্বশুরবাড়িতে। শেফালীর শয্যার পাশে তখন ছেলে সুজন। শেফালী নীরবে ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকে। সুজন মন দিয়ে মায়ের সেবা-যত্ন করে। কোনো ত্রুটি রাখে না। সে মনে মনে ভাবে, এই মানুষটাই একদিন আমার সব সুখ কেড়ে নিয়েছিল। আজ আমি তারই সেবা করছি। যে আমার ভালোবাসাকে খুন করল, যে আমার ভালোবাসাকে দুনিয়ায় থাকতে দিলো না। তাকেই আমি সেবা দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছি, ভালোবাসার চেয়ে বড় কিছু এই দুনিয়ায় নেই।
সুজনের চোখ ভিজে ওঠে। সে ভাবে—যার হৃদয়ে ভালোবাসা নেই, যে ক্ষেত্রেই হোক, সে মানুষই নয়।
