“নির্জন বনে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা”

author
0 minutes, 0 seconds Read

রূপপুর অঞ্চলে যা কিছু ঘটত, সব খবরই রাজার কাছে পৌঁছাত। রাজা মনে করতেন, তার রাজ্যের প্রতিটি মানুষের খবর রাখা তার দায়িত্ব। তাই সেপাইরা প্রতিদিনই নানা অভিযোগ ও সংবাদ নিয়ে তার দরবারে হাজির হতো।
একদিন তারা এক অদ্ভুত অভিযোগ নিয়ে এলো। তারা জানাল—এক স্বামীহারা কৃষকবধূ, নাম মুনা, এক ভয়ংকর রোগে আক্রান্ত। তার শরীর জুড়ে ঘা উঠেছে। গ্রামবাসী আতঙ্কে আছে—এই রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
রাজা কিছু না ভেবেই বললেন, “তাকে অবিলম্বে রূপপুর থেকে বের করে দাও।”
সেদিনই সেপাইরা মুনার ছোট্ট কুঁড়েঘর চারদিক থেকে ঘিরে ফেলল। “এই ঘর থেকে বের হয়ে আসো!”—তারা গর্জে উঠল।
মুনা দরজার আড়াল থেকে ভয়ে কাঁপা গলায় বলল, “কেন? রাজার হুকুম তোমার এখান থেকে চলে যেতে হবে। আমি কোথায় যাব? আমার ছোট্ট বাচ্চা আছে…”!
একজন সেপাই কঠোর কণ্ঠে বলল, “রাজার হুকুম—তুমি এখানে থাকতে পারবে না। এখনই বের হও।”
মুনার ছোট্ট ছেলে শিপন কান্না শুরু করল। মুনা তাকে কোলে তুলতে গেলো, কিন্তু অসুস্থ শরীরের কারণে ছেলেকে কোলে নিতে খুব কষ্ট হচ্ছিল।
সেপাইরা দরজায় লাঠি মারতে লাগল। “বের হবে, নাকি ঘরে আগুন দেব?”
ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে মুনা বলল, “আমি যাচ্ছি… আমার ছেলেকে নিয়ে যাচ্ছি…”! ঘর ছেড়ে বের হওয়ার সময় সে কষ্টভরা কন্ঠে বলল, “একদিন এই অন্যায়ের বিচার হবেই…”! কিন্তু তার কথা শোনার মতো মানুষ ছিল না। মুনা বুকভরা দুঃখ নিয়ে ছেলেকে কোলে নিয়ে অজানা পথে রওনা হলো।
মুনা অনেকের কাছে আশ্রয় চাইল। কিন্তু কেউ তাকে জায়গা দিলো না। সবাই তার রোগকে ভয় পেত!
শিপন ক্ষুধায় কাঁদছিল, আর মুনা অসহায় হয়ে পড়ছিল। অনেক দূর হাঁটার পর পৌঁছাল এক গভীর জঙ্গলে! চারদিকে বিশাল গাছ, সূর্যের আলো ঢুকতে পারে না ঠিকমতো। অজানা পশুপাখির ডাক, হিংস্র শব্দ—সব মিলিয়ে ভয়ের এক পরিবেশ।


মুনা মনে মনে বলল, “এখানেই থাকতে হবে… অন্য কোথাও তো জায়গা নেই!”
সে গাছের ফল খেয়ে দিন কাটাতে লাগল। ধীরে ধীরে সে জঙ্গলের জীবনে অভ্যস্ত হয়ে উঠল।
একদিন শিপনকে একটি গাছের নিচে বসিয়ে রেখে মুনা খাবারের সন্ধানে গেলো। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে সে থমকে দাঁড়াল। তার ছেলের পাশে দুটি সাপ! মুনা ভয় পেয়ে লাঠি তুলে নিলো। কিন্তু কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সে বুঝল—সাপ দুটি শিপনকে আঘাত করছে না, বরং তার পাশে বসে আছে, যেন পাহারা দিচ্ছে। তারপর তারা মুখে করে ফল এনে দিলো।
মুনার চোখ ভিজে উঠল। সে সাপ দুটিকে আদর করে বলল, “তোমরা কত ভালো!” সে তাদের নাম রাখল—জিবু আর জোজো। সেদিন থেকেই তারা মুনা আর শিপনের জীবনের অংশ হয়ে গেলো।
দিন কেটে যেতে লাগল। শিপন বড় হতে লাগল। জিবু আর জোজো তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু হয়ে উঠল।
সে যেখানে যেত, তারা তার সঙ্গে যেত। গাছে উঠলে তারাও উঠত, খেললে তারাও খেলত। জঙ্গলের সেই নির্জন জীবন ধীরে ধীরে আনন্দে ভরে উঠল।
অদ্ভুতভাবে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মুনার শরীরের রোগও সেরে গেলো। সে আবার সুস্থ হয়ে উঠল।
এদিকে রূপপুরে হঠাৎ এক ভয়াবহ ঘটনা ঘটল। রাজার মেয়েকে সাপে কামড়েছে!
রাজপ্রাসাদে হাহাকার পড়ে গেলো। অনেক ওঝা, চিকিৎসক এলেন, কিন্তু কেউ তাকে ভালো করতে পারলেন না। শেষে এক ওঝা বলল, “এক বিশেষ সাপই এই বিষ নামাতে পারে। তারা দূর জঙ্গলে থাকে, এক মা ও তার ছেলের সাথে।”
রাজা ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। “যেভাবেই হোক, তাদের খুঁজে আনো!”—তিনি আদেশ দিলেন।
সেপাইরা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে জঙ্গলে পৌঁছাল। মুনা তাদের দেখে অবাক হয়ে গেলো।
“রাজার আদেশ, আমাদের সাথে চলো,” তারা বলল।
মুনা দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “যে আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছে, আমি তার কাছে যাব না।”
তখন সেপাইরা জোর করে শিপনকে ধরে নিয়ে গেলো। মুনা চিৎকার করতে করতে তাদের পেছনে দৌড়াতে লাগল। জিবু আর জোজোও দ্রুত এগিয়ে চলল। পথে কয়েকজন সেপাই সাপের কামড়ে পড়ে গেলো, কিন্তু বাকিরা শিপনকে নিয়ে প্রাসাদে পৌঁছায়।
রাজা মুনাকে বলল, “তোমার ছেলেকে পেতে হলে এই সাপ কে দিয়ে আমার মেয়েকে বাঁচাও।”
মুনা ভেঙে পড়ল। তার চোখে জল নেমে এলো। একদিকে তার সন্তান, অন্যদিকে তার প্রিয় সঙ্গী। সে দ্বিধায় পড়ে গেলো—কাকে বাঁচাবে?
ঠিক তখন জিবু আর জোজো তার দিকে তাকাল। যেন তারা বলছে—“ভয় পেয়ো না।”
মুনা কাঁদতে কাঁদতে মাথা নেড়ে সম্মতি দিলো।
জিবু এগিয়ে গেলো। সে নিজের জীবন দিয়ে রাজকন্যার শরীর থেকে বিষ টেনে নিলো।
রাজকন্যা ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠল…! কিন্তু জিবু নিথর হয়ে পড়ে রইল।
জোজো তার সঙ্গীর পাশে চুপচাপ বসে রইল। তার চোখেও যেন কষ্ট ফুটে উঠেছিল।
রাজা নিজের ভুল বুঝতে পারলেন। তিনি মুনার কাছে ক্ষমা চাইলেন এবং তাদের জন্য একটি সুন্দর ঘর তৈরি করে দিলেন।
মুনা ও শিপন সেখানে থাকতে লাগল, কিন্তু তাদের মন ভরে উঠল না। জিবুর জন্য তাদের খারাপ লাগে।
কিছুদিন পর জোজোও তার সঙ্গীর শোকে মারা গেলো। জিবুর পাশেই তাকে কবর দেওয়া হলো।
শিপন কাঁদতে কাঁদতে বলল, “তোমরা আমার সেরা বন্ধু… তোমাদের আমি কখনো ভুলব না…”!
সে প্রতিদিন ফুল নিয়ে তাদের কবরের পাশে বসে থাকত।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *