রিমির মা মারা যাওয়ার পর বাবা আবার বিয়ে করে। কপালে দুঃখ সেখান থেকে শুরু। ভোরে ঘুম থেকে উঠেই রিমিকে কাজে লেগে যেতে হয়। সারাদিন যেন কাজের ঝড় চলে তার উপর দিয়ে। এক মুহূর্ত ফুরসৎ নাই। পড়াশোনার প্রতি রিমির গভীর আগ্রহ। স্কুলে যেতে চায় কিন্তু সাংসারিক কাজের ধাক্কায় তা হয়ে ওঠেনা। স্কুলে যাওয়ার নাম নিলে ধমকে বসিয়ে দেয়। রিমির বিমাতা নুরুন্নাহার বলে, স্কুলে যেতে হবে না। পড়ালেখা করে কি হবে? পড়ালেখা করলে মেয়েদের চুলা ঠেলতে হবে না করলেও ঠেলতে হবে। তার চেয়ে কাজ করাই ভালো। রিমি পড়ালেখার জন্য কান্নাকাটি করে। নুরুন্নাহারের প্রতিক্রিয়া, ইস আজাইরা কান্নাকাটি। পড়ালেখা করতে চায়!

নাহিদ দীর্ঘদিন ফয়সালের সংসারে কাজ করে। কাজের জ্বালায় নিজের বাড়িতেও যেতে পারে না। সে কয়েক দিনের ছুটি চায় বাড়িতে যাবার জন্য। নুরুন্নাহারের কঠিন উত্তর, না ছুটি দেওয়া যাবে না। তুই গেলে সংসারের কাজকর্ম করবে কে? এই গরু ছাগল কে দেখব? নুরন্নাহারের মাথায় তখন অন্য পরিকল্পনা। স্বামীর সঙ্গে আলাপ করে, শোনো আমার মাথায় একটা বুদ্ধি আসছে। নাহিদের সঙ্গে রিমির বিয়ে দিলে কেমন হয়? ফয়সাল বলে, না তুমি এ কি বলো? নাহিদের কত বয়স! রিমির বয়স এগারো, তা কি করে সম্ভব! শোনো চাইলে সবই সম্ভব। তুমি আর না বলো না। আমি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি এটাই চূড়ান্ত। ফয়সাল কোন ব্যাপারে বউয়ের সিদ্ধান্তে না বলে না। বউয়ের সিদ্ধান্তেই সব সিদ্ধান্ত হয়। নুরুন্নাহার নাহিদকে বলে, শোন তোকে আমরা কত ভালো জানি, কত আদর করি। আজ তুই কামলা হয়ে আমাদের মেয়ে বিয়ে করতে পারবি! আচমকা নুরুন্নাহারের ব্যবহারে নাহিদ আশ্চর্য হয়। আপনি কি বলছেন আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না! শোন তাহলে তোকে বুঝিয়ে বলি। তোর সঙ্গে আমরা রিমির বিয়ে দেব। সহজ সরল প্রকৃতির নাহিদ লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে নেয়। রিমি এ কথা শুনে কান্নাকাটি করে। বিয়ে করবে না। রিমি ছোট তার কথা কি বা আসে যায়। রিমিকে বিয়ে দেওয়া হয় নাহিদের সঙ্গে। আগে নাহিদকে বেতন দিতে হতো জামাই হওয়ার পর বেতন দিতে হয় না। নুরুন্নাহার তুষ্ট হয় তার বুদ্ধিতে। স্বামীকে প্রশ্ন করে কেমন হলো রিমির বাপ? বুদ্ধিটা কি আমার খারাপ? জামাই হওয়ায় এখন আর বেতন দিতে হবে না। ফয়সাল স্ত্রীর কথার উপর কখনো কথা বলে না। তার নির্লিপ্ত উত্তর, ভালোই হলো।

বিয়েতে রিমি খুশি না হলেও নাহিদ খুশি। রিমি ভাবে বাপ তার সন্তানের জন্য কোন কিছুই ভাবে না। তার স্ত্রী যেভাবে বলে সেভাবে কাজ করে। আজ সৎ মা বলে তার এই অবস্থা। কিছুকাল পর ছোট বয়সী রিমির কল জুড়ে সন্তান আসে। যে নিজেরই কোন কিছু গোছগাছ করতে পারে না তার উপর সন্তান। বেসামাল হয়ে পড়ে রিমি। নাহিদ রিমিকে খুব সহযোগিতা করে। নুরুন্নাহার ধমক দিয়ে বলে দু’জন মানুষ ঘাড়ে উপর বসে খাচ্ছে তার উপর আর একটা বাচ্চা। এত খরচা আমরা মেটাবো কী করে? নাহিদের সহ্য হয় না কথাটা। আমরা তো গতর খাটিয়ে খাচ্ছি। বিনা কাজে তো ভাত খাচ্ছি না। আগে বেতন দিতেন এখন তো তাও দেন না। জিনিসপত্রের দাম বেশি খাওয়া পড়ার কথা বলে, বেতন দেন না। নুরুন্নাহারের ঝাড়ি মারা উত্তর। খাইতে কম লাগে নাকি? ছোট বাচ্চা কান্নাকাটি করে। রিমি যদি বাচ্চা কে নিয়ে একটু বসে ওমনি শুরু হয় নুরুন্নাহারের চেঁচামেচি। কাজ রেখে এক মুহূর্ত বসা যাবে না আগে কাজ তারপর বসা। রিমি নাহিদকে বলে, আমরা আর এখানে থাকবো না। তুমি অন্য কোথাও কাজ করলে নিজের স্বাধীনতাও পাবে টাকা পয়সা রোজগার হবে। এখানে নামের জামাই। কামলার মতো কথা শুনতে হয়। কথা কথাগুলো শুনে ফেলে নুরুন্নাহার। বলে, জামাইয়ের সাথে শলাপরামর্শ করা হয়। বলেই রিমিকে মারতে শুরু করে। নাহিদ বলে, ওর গায়ে হাত তুলবেন না। ও আমার স্ত্রী। আমার স্ত্রী গায়ে হাত তোলার আপনি কে? রুনা ক্ষেপে যায়, কী আমারটা খেয়ে আমারটা পরে আমার মুখের উপর কথা। রিমি তার বাবারটা খায়। তাছাড়া রিমি কাজ করে আমি কাজ করি সেই হিসেবে খাই। আর আমরা এখানে থাকবো না। এই কথা শুনে নুরুন্নাহারের মাথায় আগুন ধরে যায়। পাশে ছিল মাটির কলস। সেটা তুলে রিমির দিকে ছুড়ে মারে। রিমির কোলে ছিল বাচ্চা, কলসি বাচ্চার মাথায় লাগে। স্রোতের মতো বাচ্চার মাথা থেকে রক্ত বের হতে থাকে। ডাক্তারের কাছে যাওয়ার আগেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে বাচ্চা মারা যায়। শুরু হয় সন্তান হারা মায়ের বুকফাটা আত্মচিৎকার। একি সর্বনাশ হলো আমার। কেন আমার মৃত্যু হলো না। নাহিদ আর থাকে না শ্বশুর বাড়ি মৃত বাচ্চা ও স্ত্রীকে নিয়ে বাড়ি চলে যায়। বাচ্চার দাফন-কাফন করে নিজ বাড়িতে গিয়ে। রিমির কান্নার শেষ হয় না। তার একমাত্র আশার আলো হারিয়ে গেল। সামান্য স্বার্থ পূরণে কেউ কেউ কারো জীবন বিরান করে দিতে দ্বিধা করে না। সংঘাতের পৃথিবীতে রিমি আর নাহিদের জীবনে হয়তো জ্বলে উঠতে পারে কোন আশার আলো। যে আলোয় হয়তো তারা খুঁজে পাবে বেঁচে থাকার নতুন অনুপ্রেরণা।
