
রোকেয়া আসা-যাওয়ার পথে প্রায় লক্ষ্য করে ছেলেটাকে। যখন দেখা হয় অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে রোকেয়ার যাত্রাপথের দিকে। রোকেয়া সরাসরি না তাকালেও আড়চোখে দেখে। ছেলেটির নাম সিরাজ, থাকে তাদের পাশের মহল্লায়। সুদর্শন যুবকের স্মার্টনেস তাকে আকর্ষণ করে। রোকেয়ার ভালো লাগে সিরাজকে। দু একটা কথাবার্তা থেকে ভালোলাগা পরে ভালোবাসা। রোকেয়ার মায়ের চোখে ব্যাপারটা ধরা পড়ে। তিনি খোঁজখবর নিয়ে মেয়েকে সতর্ক করেন। ছেলেটি বেকার এবং পড়ালেখা খুব একটা করেনি। রোকেয়ার বাবা চাকুরীজীবী। সচ্ছল সংসার তাদের। রোকেয়ার মা মনে করে মেয়ের বিষয়টি স্বামীকে অবগত করা দরকার। মেয়েটার মতিগতি ভালো না। কিন্তু তার আগেই ঘটনা ঘটে যায়। রোকেয়া আর সিরাজ গোপনে বিয়া করে। বাবা খলিল মোটাসোটা মানুষ এবং প্রেসারের রোগী। শারীরিক কারণে মেজাজ ঠান্ডা রাখতে হয়। তিনি স্ত্রীকে বললেন, বিয়ে যখন করে ফেলেছে তখন মেনে নেও। নিজের ভাগ্য নিজে তৈরি করলে কার কী বলার আছে।
সময় চোখের নিমিষে পার হয়ে যায়। রোকেয়া সংসার বুঝে ওঠার আগেই হয়ে যায় দুই সন্তানের মা। অদৃষ্ট কাকে বলে, একদিন শুনতে পেল পিতার আকস্মিক মৃত্যু সংবাদ। পাঁজর ভাঙ্গা হাহাকারে বিদীর্ণ হল অন্তর। বাবা তাকে মুখে কিছু না বললেও তিনি ছিলেন নিঃশব্দ আশীর্বাদের উৎস। এদিকে রোকেয়ার শ্বশুরবাড়ি থেকে বাড়ছিল তাদের আলাদা হয়ে যাবার চাপ। দিশেহারা হয়ে পড়ে সে। স্বামীকে বলে, এভাবে তো আর জীবন চলে না। সিরাজ জেনেছে ব্যাটারির অটো চালালে বেশ ভালই আয় হয়। অটো কেনার মত অত টাকা তার কাছে নাই। নিরুপায় রোকেয়া তার অসহায় মায়ের কাছ থেকে কিছু টাকা এনে দেয়। ভালোই চলছিল বেশ কিছুদিন। কিন্তু স্বচ্ছন্দে যদি সব চলবে তাহলে ছন্দপতন শব্দের ব্যবহার তো বন্ধ হয়ে যাবে। ঘটনার ঘনঘটা বন্ধ হয়ে গেলে স্থবির হয়ে যাবে দুনিয়ার গতি। অকস্মাৎ একদিন রোকেয়ার খবর পায় তার স্বামী হাসপাতালে। ছুটে যায় সেখানে, সিরাজের অটোর সঙ্গে ট্রাকের ধাক্কা লেগেছিল। ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায় রোকেয়ার স্বপ্ন। সিরাজ হাসপাতাল থেকে মুক্তি পায় চলৎশক্তিহীন হয়ে।
রোকেয়া ভাবে ভেঙে পড়লে চলবে না, সংসার এবং স্বামী দুটোই খাড়া রাখতে হবে। কাজের খোঁজে লেগে যায়। মাত্র এইট পাশ দিয়ে কি আর কাজ পাওয়া যাবে! মনে পড়ে ভালোবাসার তেষ্টায় পড়ালেখার প্রতি কেমন অবহেলা করেছিল। অনেক খোঁজখবর করে এক হাসপাতালে নাইট শিফটে আয়ার কাজ পাওয়া যায়। নিরুপায় রোকেয়া সেখানে কাজে যোগ দেয়। দিনে সংসারের কাজকর্ম রাত্রে হাসপাতালে কাজে বিরামহীন সময় কাটতে থাকে। একদিন লক্ষ্য করে পাশের ঘরের রুমা সিরাজের সঙ্গে কথা বলছে। কিছুদিন পর ঘটে আরেক বিচিত্র ঘটনা। রোকেয়া ঘরে ঢুকে দেখে লাল শাড়ি পড়ে রুমা সিরাজের পাশে বসে আছে। সিরাজ একটু সংকোচ নিয়ে বলে, রাত দিন কাজ তুমি আর কত করবা। তোমার কষ্ট কমাতে ওকে বিয়ে করলাম। রুমা বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো ছিটকে বের হয়ে যায়। চিৎকার করে বলে, আল্লাহরে! এখন আমি কী করি!
