
নারীর রূপ নিয়ে কমবেশি কথা হয় কিন্তু সেটা বেশি হয় তার বিয়ের সময়। মেয়ে কালো হলে তো কথাই নেই। সে শুধু কবির কবিতায়। তাতে সভ্যতা অন্তত কিছুটা রক্ষা পায়। কে শুনে কার কথা। মেয়ের রং একটু কালো হলে ঠোঁট উল্টে বলা হয় ‘মেয়ে কালো’। ললিতা এতই কালো যে তার বিয়েই হচ্ছিল না। বিয়ের কোন প্রস্তাব এলে ললিতাকে দেখার পর চুপ মেরে যায়, আর কিছু জানায় না। ললিতার অভিভাবকদের বুঝে নিতে হয়, মেয়ে পছন্দ হয়নি। এ নিয়ে ললিতার বাবা মায়ের মন কষ্টের শেষ নাই। তারা সান্ত্বনা খুঁজেন, আল্লাহ যেদিন লিখে রেখেছেন সেই দিন বিয়ে হবে। এর মাঝে এক পাত্রপক্ষ জানায় ললিতাকে তাদের পছন্দ হয়েছে। পাত্রের নাম ফয়সাল, তার সঙ্গে ললিতার বিয়ে হয়। ললিতার বাবা মা বাঁচেন হাঁফ ছেড়ে।
ললিতা স্বামীকে বলে, আমি তো কপাল গুনে পেলাম তোমার মতো ভালো স্বামী। কিন্তু তুমি তো পেলে কালো একটা বউ। ললিতা কালো হলেও তার মুখের গড়নে ছিল মায়াবী আকর্ষণ। ফয়সাল বলে, তোমার কালো না তোমার গুনে সবকিছু আলো করে রাখবে। আমি চাইছিলাম একটা সংসারী লক্ষী মেয়ে তা তোমার মধ্যে পেয়েছি! স্বামীর কথা শুনে ললিতার প্রাণটা জুড়িয়ে যায়। দোয়া করো মৃত্যুর আগ পর্যন্ত যেন তোমার সেবা যত্ন করে মরতে পারি। স্বামী বলে, জানি আমার লক্ষী বউটার কাছ থেকে অঢেল সেবা-যত্ন পাব। তোমাকে রেখে একা একা আমার ঢাকায় থাকতে ভালো লাগে না। ললিতা বলে, তাতে কী তুমি তো প্রতি সপ্তাহে আসছো। ফয়সাল বলে, ব্যবসাটা একটু বড় হলে তোমাকে নিয়ে যাব আমার কাছে। তখন সপ্তাহ পার হবার অপেক্ষায় থাকতে হবে না। আমরা দু’জন দু’জনকে প্রাণভরে দেখতে পাবো ভালোবাসতে পারবো। ললিতা হাসে। ফয়সাল স্ত্রীকে সোহাগ করে বলে, ওরে আমার বউরে কত খুশি।
ললিতার কোলজুড়ে ফুটফুটে একটা সন্তান আসে। ললিতা অবাক বিস্ময় দেখে বাচ্চা তার মতো হয়নি। সবাই অবাক। ললিতার বড় বোন নিপা বলে, তোর ঘরে তো আলো ঝলমল চাঁদ এসেছে। বুবু সবই আল্লাহর দান। আমি হইছি কালো আমার ঘরে আল্লাহ পাক দিয়েছেন রাজকন্যা। দেখিস তোর এই রাজকন্যার জন্য কত ছেলে আসবে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। বুবু যে কি বলনা। ললিতা আর ফয়সাল দু’জনে মিলে মেয়ের নাম রাখে আনিকা। আনিকা হওয়ার পর যেন তাদের ভাগ্য খুলতে থাকে। ফয়সাল ঢাকার ব্যবসা বড় পরিসরে শুরু করে। ব্যবসা বেশ ভালো চলে। বউ বাচ্চাকে নিজের কাছে নিয়ে আসে।
নিপা ছেলে নাসিরকে নিয়ে ললিতার বাসায় বেড়াতে আসে। আনিকাকে দেখে বলে, হায় হায় একি তোর মেয়েটা তো দিন দিন সুন্দরী হয়ে উঠছে। ললিতা তোর মেয়েকে আমার ছেলের বউ করে নিব। বুবু তুমি যে কী বলো না! নিপা সিরিয়াস হয়ে বলে, না তুই কথা দে। ললিতা বলে, এখনকার যুগ তুমি আমি কথা দেব? পরে এ কথা যদি না রাখতে পারি! ক্যান রাখতে পারব না তুই আমি ঠিক থাকলে? তোর এত সুন্দর মেয়েটাকে আমি চাই ও আমার ঘরের বউ হবে। দেখা যাক বুবু। ছেলে মেয়ে পড়াশোনা করুক। তারপর বড় হয়ে ওরা সিদ্ধান্ত নিবে। ললিতার নির্লিপ্ততায় নিপা একটু রাগ হয়ে বলে, আমরা কি ওদের খারাপ চাই? ওরা আমাদের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারবে না? ললিতা বলে, বুবু আমি তা বলি নাই। ওরা দু’জন বড় হয়ে যদি এই সিদ্ধান্ত মেনে নেয় তাহলে ভালো। আর না হয় ওরা যে সিদ্ধান্ত নেয় সেটাই মেনে নেব। নিপা একটু শক্ত করে বলে, তুই আর কথা বলিস না তো ললিতা। ঠিক আছে বুবু আর বলবো না। নিপার জেদি আর একরোখা স্বভাবের কারণে তার সঙ্গে কেউ তর্ক করতে চায় না।
আনিকা এসএসসি পাশ করে। ফয়সালা আর ললিতার মেয়েকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন। তাদের মেয়ে ডাক্তার হবে। আনিকাও চায় বাবা-মার সেই স্বপ্ন পূর্ণ করতে। সে কলেজে ভর্তি হয়। দারুণ লক্ষী মেয়ে। কলেজ থেকে ফিরে মাকে সাংসারিক কাজে সাহায্য করে। ললিতা মেয়েকে বলে, মা তোকে কাজ করতে হবে না তুই কাজ করলে আমার কষ্ট লাগে। তুই যে হাতে কলম ধরেছিস সেই হাতে কলম থাক আমি তাই চাই। আনিকা বলে, আমি পড়ালেখার সময় তো পড়ালেখা করি। তুমি সারাদিন কত কাজ করো। আমার চোখে তুমি শ্রেষ্ঠ মা।
নিপা বোনকে বলে, তোরা সবাই মিলে আয় আমার বাড়িতে বেড়িয়ে যা। ললিতা বলে, না বুবু সময় কই? মেয়ের পড়ালেখা। তারপর ফয়সালের ব্যবসা এগুলো রেখে সময় কোথায়। নিপা বলে, কাজকাম তো থাকবেই তার জন্য কি বোন হয়ে বোনের বাড়ি বেড়াতে আসবি না? ঠিক আছে বুবু আসব। লতিতা স্বামীকে বলে, বুবু এত করে বলে তার বাড়ি যাওয়ার জন্য চলো না আনিকাকে নিয়ে বেড়াতে যাই। ফয়সাল বলে, ঠিক আছে সময় সুযোগ করে যাওয়া যাব বেড়াতে।
নিপা আবার ফোন করে ললিতাকে বলে, কিরে তোকে এত করে আমার বাড়িতে বেড়াতে আসার কথা বলি তা তো আসোস না। ললিতা বলে, এইতো বুবু আসব। স্বামীকে বলে, শোনো বুবুজান অনেক করে বলছে। চলো ওখান থেকে একবার ঘুরে আসি। ফয়সাল বউয়ের কথায় গুরুত্ব দিয়ে বলে, কবে যেতে চাও বল? ললিতা স্বামী সন্তান নিয়ে বোনের বাড়ি বেড়াতে যায়। মনে খুব আনন্দ। নিপাও বোনকে দেখে অনেক কিছুর আয়োজন করে। ললিতা বলে, বুবু তুমি এতো আয়োজন করেছ এর কি দরকার ছিল? খাওয়া-দাওয়া শেষে নিপা ছোট বোন ললিতার কাছে প্রসঙ্গটি তোলে। তোকে বলি, নাসির আর আনিকার বিয়েটা সেরে ফেলতে হয় এবার। এমন কথার জন্য ললিতা মোটেও প্রস্তুত ছিল না। সে বলে, বুবু তুমি কী বলো মেয়ে আমার পড়ালেখা শেষ করবে ও ডাক্তার হবে। নিপা বলে, মেয়েদের এত পড়ালেখার দরকার নেই। ললিতা এমন কথা শুনবে আশা করিনি, মুখ ফসকে কথাটা বেরিয়ে যায়। বুবু তোমার ছেলে তো পড়ালেখা করলো না। ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়ছে। আমার মেয়ে কি তোমার ছেলেকে বিয়ে করতে রাজি হবে?
ওর রাজি হওয়ার কী আসে যায়? তুই আমি রাজি আর কী লাগে?
না বুবু আমার মেয়ে যতদূর পড়তে চায় ও ততদূর পড়বে।
ললিতা আমি তোর বড় বোন আমি যা বলি একবার ভেবেচিন্তে দেখ! তুই চাস মেয়েরে দিয়ে চাকরি বাকরি করাতে। আমি চাই মেয়ে বাড়ি থাকবে ঘর সংসার করবে। আমার যা আছে তা তোর মেয়ে আরাম আয়েশে খেয়ে পড়ে যেতে পারবে।
বুবু দিন বদলেছে এখন আর সেই আগের দিন নাই। তাছাড়া ফয়সালও তোমার ছেলের সাথে আমার মেয়ের বিয়ে দিতে রাজি হবে না।
নিপা রাগ হয়ে বলে, এইভাবে তুই আমার মুখের উপর বলতে পারলি!
বুবু তুমি রাগ করো না। তুমি আমি বোন আছি বোনই থাকি। নিপার আশা ছিল বোনের মেয়ের সঙ্গে বিয়ে হলে তার বখাটে ছেলেটার একটা গতি হবে।
আনিকার কানে যায় কথাগুলো। শুনে মায়ের সাথে কান্নাকাটি করে। আমি তোমার বোনের ছেলেকে বিয়ে করব না। আমি পড়ালেখা করবো। আর তোমার বোনের ছেলে পড়ালেখা করে না, খায় দায় আর ঘুরে বেড়ায়। আনিকার চোখে অশ্রু। ললিতা মেয়েকে বুঝায়, তোকে কান্না করতে হবে না। আমার কি আক্কেল জ্ঞান নাই নাকি? আমি ওই ছেলের সঙ্গে তোর বিয়ে দিব না। আমরা কালকে ঢাকা চলে যাব। রাতটা কোনভাবে পাড়ি দেই। ফয়সাল শুনতে পেয়ে বলে, এসব কী শুনছি? আমরা মেয়েকে এই ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেব না। চলো আমরা সকালে ঢাকায় চলে যাই।
নিপা শান্ত হয়ে বলে, তোদের ঢাকা যেতে হবে না। বেড়াতে এসেছিস দুই দিন থাক।
বুবু তুমি রাগ করোনা। আমরা সকালে যেতে চাই। নিপা ভাবে, যদি সকালে চলে যায় তাহলে আমার ছেলের সঙ্গে ওর মেয়ের বিয়ের সম্ভাবনা শেষ হয়ে যাবে। কৌশলে ওদের যাওয়া বন্ধ করতে হবে।
থাক মেয়ের যখন বিয়ে দিতে চাস না দিবি না। সবাই মিলে গল্প করতে থাকে। নাসিরও আসে। পরিবেশ স্বাভাবিক হয়ে আসে দ্বন্দ্ব ভুলে। এখানে যে কোন ঘটনা ঘটতে পারে এমন বোঝার মতো আলামত ছিল না। সবাই আনন্দ উল্লাস নিয়ে গল্পে মেতে ওঠে। মুহূর্তে ঘটে গেল এক অকল্পনীয় ঘটনা। হঠাৎ আনিকা আত্মচিৎকার করে ছিটকে পড়ে। কাটা মুরগির মতো মেঝেতে গড়াগড়ি করে দাপাতে থাকে। মা আমার কী হলো? পুড়ে গেলাম জ্বলে গেলাম! আনিকার মুখমন্ডল থেকে শরীরের এক পাশ নিক্ষেপ করা এসিডে ঝলসে গেছে। ললিতা আর ফয়সাল বাকরুদ্ধ ঘটনার আকস্মিকতায়। কিছুই বুঝতে উঠতে পারে না। ফয়সাল নাসিরকে ধরবে নাকি মেয়েকে ধরবে। এই ফাঁকে নাসির দৌড়ে পালিয়ে যায়। ললিতার চিৎকারের উপর চিৎকার! আমার মেয়েরে কী সর্বনাশ করল! নিপা সংকটময় এই অবস্থার মধ্যেও বিড়বিড় করে বলতে থাকে তার ক্ষোভের কথা। মেয়ের বিয়ে দিবি না এবার খেলা বোঝ। ললিতা মেয়েকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যায়। ফয়সাল থানায় যায় পুলিশ নিয়ে আসে। পুলিশ নিপাকে গ্রেফতার করে। আর নাসির পলাতক। আনিকা হাসপাতালের বেডে শুয়ে কাতরাতে থাকে। ভাবতে থাকে কী এমন পাপে তার এই প্রায়শ্চিত্ত। আপন জনের মাঝেও কেন নিরাপদ নয় নারী। অনন্তকাল ধরে কেন এমন হয়ে আসছে।
