
শান্তির সংসার নুরজাহানের। দৃশ্যমান দুঃখ কষ্ট বা সংকটহীন যেন সে সংসার। স্বামী স্ত্রী পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা আর বোঝাপড়ায়ও কমতি নেই। স্বামী স্ত্রী পুত্র কন্যাদের নিয়ে সুখেই কাটছিল তাদের দিন। জীবনের প্রথম দিকে ইমরান হোসেন পুলিশে চাকরি করতেন। সে কিছুকাল আগের কথা। ইমরান খুব নম্র ভদ্র স্বভাবের মানুষ। ইমরানের আত্মীয়-স্বজন তাঁকে বলেছিলেন তুমি কি পারবে পুলিশের চাকরি করতে? ইমরান দেখা যাক, বলে শুরু করেছিল চাকরিজীবন। থানায় সহকর্মীরা ইমরানের কর্মকাণ্ড দেখে আড়ালে হাসাহাসি করে। আসামিদের জবানবন্দী বা স্বীকারোক্তি গ্রহণে কিঞ্চিৎ বল প্রয়োগ বা মারধর ছিল অবধারিত। সেই প্রক্রিয়া চালালে বেশ কাতর হয়ে পড়তো অনেকে। ইমরান তাদের জন্য খাবার এবং ঔষধ এর ব্যবস্থা করত। কোন আসামীকে কাঁদতে দেখলে তাঁর মন খারাপ হতো। আসামীর যে কোন সাজানো মিথ্যা কথা সে বিশ্বাস করে ফেলত। থানায় এক চোরকে ধরে আনা হয়েছে। তাকে বেদম পেটানো হয়। চোর কিছুক্ষণ পর পানি পানি বলে চিৎকার শুরু করে। ইমরান তার জন্য পানি রুটি কলার ব্যবস্থা করে। এত দরদী হৃদয়ের মানুষ ছিল সে। সহকর্মীরা বলে, আপনাকে নিয়ে আর পারা গেল না। আসামীকে এভাবে শুশ্রূষা করলে ওরা কি আর পুলিশকে ভয় পাবে? আসামিকে এমন আদর যত্ন করলে ওদের কাছ থেকে কথা বের করা যাবে না। আর ভয়ও পাবে না পুলিশকে। ইমরান হোসেন বলেন, কী করবো আমার খারাপ লাগে। এক সহকর্মী বলেন, আপনার দ্বারা এ কাজ হবে না ইমরান সাহেব। বয়স কম আছে, আপনি অন্য চাকরির খোঁজ করেন। কাউকে পিটাতে বললে পিটাতে পারেন না। কাউকে কাঁদতে দেখলে মায়া হয়। এ নিয়ে অন্য সহকর্মীদের কাছে কথা শুনতে হয়। ইমরান হোসেন সিদ্ধান্ত নেন তিনি এই চাকরি আর করবেন না। তিনি চাকরিতে ইস্তফা দেন। চাকরি ছেড়ে দিয়ে বাড়িতে আসেন। মলিন মুখ দেখে নুরজাহান বলেন, কী হয়েছে আপনার। শরীর খারাপ?
না।
আপনাকে কেমন যেন দেখাচ্ছে।
শরীর ভালই আছে, ও নিয়ে তুমি ভেবোনা। তোমাকে একটা কথা বলি। আমি চাকরি ছেড়ে দিয়েছি।
হায় বলেন কি! ছেলে, মেয়ের সংসার, এখন কী উপায় হবে?
চিন্তা করোনা। আল্লাহ আছেন। তিনি একটা উপায় বের করে দিবেন।
সেই আমলে চাকরির বাজার এতটা আকড়া ছিল না। কিছুদিনের মধ্যে ইমরান হোসেন চাকরি পেয়ে যায় রেলওয়েতে। নুরজাহান হাফ ছেড়ে বাঁচে। হাসি খুশিতে ভালোই চলতে থাকে তাদের সংসার। অলক্ষে বিধাতা বুঝি নির্ধারণ করেছিলেন অন্য কিছু। একদিন এক মহা দুর্ভোগ নেমে আসে ওই সংসারে। রাস্তা পার হতে গিয়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মারা যান ইমরান হোসেন। বিনা মেঘে বজ্রপাত আর কাকে বলে। গারো অন্ধকার ঢেকে যায় নুরজাহানের জগৎ সংসার। শুধু কান্নায় যেন শেষ হয় না শোকের মাতাম। অনিশ্চয়তা আর হতাশা গ্রাস করে তিন পুত্র চার কন্যার পরিবারকে। অলক্ষ্য এবং অসতর্কতায় পরিবারের আয়তন বৃদ্ধির জন্য আড়ালে আবডালে অনেক কথা শুনতে হয়েছে। এতগুলি ছেলেমেয়ে নিয়ে এখন কী করবে, হতাশায় বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে নুরজাহান। দুর্দিনের এই সংকটকালে নুরজাহানের পাশে দাঁড়ায় তাঁর ছোট ভাই ফয়সাল আহমেদ। তিনি বোনকে বলেন, তুই কোন চিন্তা করিস না, আমি তো বেঁচে আছি। একটা উপায় হবেই। আমি যদি খাই তুইও খাবি। আল্লাহ কাউকে মারেন না, তিনি তার বান্দাদের রিজিকের ব্যবস্থা করে রাখেন। ফয়সাল আহমেদ বোন নুরজাহানের দেখভালের দায়িত্ব নেন।
নুরজাহানের ভাইদের তখন একান্নবর্তী সংসার। বোনের বিশাল সংসার দেখে নুরজাহানের বড় ভাই মোহিত আহমেদ ছোট ভাই ফয়সালকে সতর্ক করেন। আমি কোন ঝামেলা চাই না। আমার ঘাড়ের উপর যেন কোন ঝামেলা না আসে। ফয়সাল আহমেদ নীরব থাকেন। মায়ের পেটের বোন স্বামীহারা, বিপদকালে তাঁর পাশে না দাঁড়ালে সে কিসের ভাই। বোন ভাগ্নে, ভাগ্নিদের দেখাশোনা না করে তাদের তো ফেলে দিতে পারবো না। নুরজাহানের সতর্ক দৃষ্টি ছিল ভাইয়ের দায়িত্ব গ্রহণ যেন বোঝায় পরিণত না হয়। শুধু ভাই নয় নুরজাহান কিংবা তার সন্তানেরা যেন কারো কাছেই বোঝা হয়ে না দাঁড়ায়। ইমরান হোসেনের যা কিছু অবশিষ্ট ছিল সেটুকু অবলম্বন করে বাঁচাতে হবে পরিবারকে। ছেলে মেয়েদেরও বোঝাতে সক্ষম হয় কী করে বইতে হবে ভাগ্য বিপর্যয়ের প্রতিঘাত। সাধারণ মেধার মানুষ হলেও বুদ্ধিমত্তার শেষ বিন্দু পর্যন্ত ব্যবহার করে নুরজাহান। মাঝে মাঝে হতাশ হয়ে পড়তো। বুকফাটা আর্তনাদে গলা ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করে। কাউকে বুঝতে না দিয়ে গভীর রাতে মুখে বালিশ চাপা দিয়ে কাঁদত সে। নামাজ পড়ার সময় প্রায় ভিজে যেত জায়নামাজ চোখের পানিতে।
তার প্রথম করণীয় ছিল ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া। নুরজাহান বুঝতে পারে জমা টাকা বসে খেলে দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যাবে। ভাই ফয়সাল তাঁর ব্যবসায়ী বন্ধুর কাছে কিছু টাকা বিনিয়োগের ব্যবস্থা করে দেয়। সেখান থেকে মাসিক একটি লভ্যাংশ আসতে থাকে। জমি বন্ধকের বিনিময়ে ফসলের একটি অংশ পাওয়ার ব্যবস্থা যা দাদন বা গিরভি নামে পরিচিত। সেই ব্যবস্থায় প্রায় ‘বছর-এর ধানের’ যোগান সেখান থেকে হয়ে যায়। নুরজাহান সেই ধান নিজ হাতে সিদ্ধ শুকনো করে চাউল কলে পাঠাতেন। তাতে কিছু টাকা সাশ্রয় হত। নুরজাহান ক্ষমতা অনুযায়ী সাধারণ নারীর সর্বোচ্চ বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে সংসার চালাতে থাকেন। যাতে কারো মুখাপেক্ষী বা নির্ভরশীল হতে হয় না। স্বামীহারা নারীর সীমাহীন দুর্দশা সে প্রত্যক্ষ করেছে। তার উপর রয়েছে সন্তানের বিশাল বোঝা। মাঝে মাঝে হতাশ হয়ে পড়তো, সে কি পারবে মান-সম্মান নিয়ে শেষ পর্যন্ত টেনে যেতে। যতটুকু সম্ভব সন্তানদের পড়ালেখা করাতে চান।
দুহাতে পাহাড় ঠেলে সরানো মতো কঠিন সংগ্রামে চলতে থাকে জীবন। অনেক চড়াই উৎরাই পাড়ি দিয়ে নুরজাহানের ছেলে-মেয়ে এখন বড় হয়েছে। ছেলেকে বিয়ে করাবে মেয়েদের বিয়ে দিবে। বড় ছেলে আবিরকে বিয়ের কথা বললে, আবির বলে, না মা আমি বিয়ে করবো না। আমার বোনদের বিয়ে দিয়ে তারপর আমি দেখবো ভেবে। এখন ছেলে আবির সংসারে হাল ধরছে। আবির ভাবে আমার মা আমাদের নিয়ে অনেক কষ্টে দিন পারি দিয়েছে। মাকে সংসারের চিন্তা থেকে মুক্তি দিতে হবে। আবির পড়াশোনা শেষ করে এখন ব্যবসা করে। এক এক করে চার বোনকে বিয়ে দেয়। আবির তারপর ছোট ভাইকে বিয়ে করায়। নুরজাহান বলেন, বাবা সংসারে সব দায়িত্বই পালন করছো। এখন আমি তোমার বিয়ে দেখতে চাই। নাতি নাতনির মুখ দেখতে চাই। আবির ভার্সিটিতে পড়ার সময় একটি মেয়েকে ভালোবাসতো, সেই মেয়ের কথা মায়ের কাছে বলেন। নুরজাহান প্রস্তাব নিয়ে মেয়ের বাড়িতে গিয়ে হাজির হন। মেয়েটিকে তাঁর খুব ভালো লাগে। আংটি পরিয়ে সেদিনই আশীর্বাদ করেন। বিয়ের কথাও পাকাপাকি করেন। নাফিজা খুব খুশি তাঁর ভালোবাসার মানুষকে পেতে যাচ্ছে। আবিরকে ফোন করে বলেন, আমার শাশুড়ি আমাকে দেখে যখন হাতে আংটি পরালেন আমার খুব ভালো লাগছিল। আবার লজ্জাও লাগছিল। নাফিজা তোমাকে আমি স্ত্রী হিসাবে পাব আমি খুবই আনন্দিত। দু’জনের একই আনন্দে প্রাণের উল্লাসে ভরে যায় তাদের মন।
নুরজাহান ছেলের বউ ঘরে তুলেন। বৌমা এই সংসার এতদিন আমি ছেলে মেয়ে নিয়ে দিনপার করছি। সেই সংসারে চাবি আজ তোমার হাতে দিলাম। তুমি দেখে রেখো মা। স্বামীর কথা বড়ই মনে পড়ছে তাঁর। যদি তিনি বেঁচে থাকতেন এই পূর্ণতার আনন্দে দেখে কতই না আনন্দিত হতেন। কিভাবে যে সময় চলে যায় সেই কৈশোর যৌবন পাড়ি দিয়ে আজ বৃদ্ধ বয়স। নুরজাহান বুক খালি করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। মনে করেছিল হেরে যাবে জীবনের কাছে। বিধাতার অশেষ দয়ায় সে পরাজিত হয়নি। অপরাজিতা সে।

