
বিনয়দা বয়সে একটু বড় হলেও তার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ছিল বন্ধুর মত। আমার নাম হাসান আলী, তিনি আমাকে শুধু হাসান বলেই ডাকতেন। আমাদের পরিচয় পর্বটি ছিল কাকতালীয়। হাসপাতলে চিকিৎসাধীন পাশাপাশি বেডের দুজন রোগীর দর্শনার্থী ছিলাম আমরা। সেই থেকে পরিচয়, খাতির। আমার রোগী ছিল আমরা ভাগ্নে আর বিনয়দার রোগী তার ভাতিজা। সম্পর্কের কারণে আমাদের উপরে রোগীদের দাবিটা ছিল একটু বেশি। পরিচিত কিংবা আত্মীয়-স্বজন হাসপাতালে ভর্তি হলে কেউ দেখতে আসবে এটাই স্বাভাবিক। দেখতে না এলে রোগী মন খারাপ করে। এটা যেন একটি সামাজিক রেওয়াজ। ডাক্তার সাহেবরা বলেন, দর্শনার্থীদের কারণে রোগীর আরোগ্য লাভ বিঘ্নিত হতে পারে। বোধ করি কথাটা ঠিক। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে জাতীয়ভাবে উদাসীন আমরা। এছাড়া চিকিৎসাধীন রোগী শারীরিক ভাবে থাকেন নাজুক অবস্থায়। দর্শনার্থী অজান্তে নতুন কোন রোগ বালাইয়ের বাহক হতে পারেন। তাতে চিকিৎসাধীন রোগীর নতুন রোগ সংক্রমণের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। ব্যাপারটা অনেক সময় বোঝানো সম্ভব হয়ে ওঠে না। এ বিষয়ে বিনয়দা আমার সঙ্গে সহমত পোষণ করেন। বিনদার বিনয়ী স্বভাব আমাদের মুগ্ধ করে। বিনদার স্ত্রী শোভা বৌদির আন্তরিকতা আমাদের প্রায় একই পরিবারভুক্ত করে ফেলে।
তখন জৈষ্ঠ মাস, আমের মৌসুম। একদিন সপরিবারে আমাদের নিমন্ত্রণ হলো বিনাদার বাড়িতে। শোভা বৌদির ছিল রান্নার চমৎকার হাত। সাধারণ জিনিস তার রান্নার গুনে হয়ে উঠতো অসামান্য। সেদিন রান্না হয়েছিল চিতল মাছের কয়েক পদ। খাওয়া দাওয়ার পর বৌদি হাজির করলেন বিশেষ এক আম। সুমিষ্ট ফলটি স্বাদে ঘ্রাণে সত্যি ছিল অপূর্ব। সেগুলো সংগ্রহ করা বিনয়দার বিশেষ কৃতিত্ব। আমরা সবাই আমগুলো খেলাম অত্যন্ত তৃপ্তি সহকারে। আমের মৌসুমে প্রথম আম খেলাম। বুঝলাম স্বাদের এই আম খাওয়ানোর জন্যই আজকের এ নিমন্ত্রণ। একটা ব্যাপার আশ্চর্য হয়ে অনেকক্ষণ লক্ষ্য করি, বিনয়দা আম স্পর্শ করলেন না। আমি ভদ্রতা করে অনুরোধ করলাম। বারংবার অনুরোধে শোভা বৌদি বললেন, ও এখন খাবে না। ব্যাপারটি আমাকে আশ্চর্য করে। মনে হল এর পিছনে কোন রহস্য আছে। আমি রহস্য উন্মোচনে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। অগত্যা বিনয়দা প্রকাশ করলেন সেই রহস্য। সে কথা শুনে কয়েক মুহূর্তের জন্য নিশ্চুপ হয়ে গেলাম। বিনয়দা বললেন, আম হচ্ছে অমৃত ফল। বাবা মাকে না খাইয়ে এই ফল আমি খাই না। চকিতে নিজের মায়ের মুখটা ভেসে উঠলো মানসপটে। বৃদ্ধ পিতা মাতার প্রতি গভীর অনুরাগ দেখে শ্রদ্ধায় ভরে উঠলো মন। এমন মানুষও পৃথিবীতে আছে। বিনয়দা ভিতরে গিয়ে কাপড়-চোপড় পড়ে বেরিয়ে এলেন। হাতে এক ব্যাগ ভর্তি আম। বললেন, বাড়ি যাবো দেখি শেষ গাড়িটা ধরতে পারি কিনা। আপনারা বসেন চা খেয়ে যাবেন। আমি অবাক বিস্ময়ে বিনয়দার যাত্রা পথের দিকে তাকিয়ে রইলাম। একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো ভেতর থেকে।
