
অনন্তকালের বৈষম্য নিয়ে জন্মগ্রহণ করে নারী শিশু। আজও কোন ব্যতিক্রম হয়নি সমাজ সংসার এবং কাল মহাকালে। পুরুষ শিশুর জীবন তুলনায় অনেকটা স্বাচ্ছন্দের। বৈষম্যটা যেন জমাট বাঁধা পাথরের মতো মানব সভ্যতায় বুকে সেঁটে আছে। সীমা জানালায় দাঁড়িয়ে আকাশ পানে চেয়ে ভাবছিল। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত চলা নারী জীবনের বৈষম্য। কৈশোরের স্বাভাবিক চপলতায় প্রাপ্য ভৎসনা ছিল মনজাতনার কারণ। পারিবারিক অনাবশ্যক শাসন এবং কঠোরতায় বিদ্রোহী হয়ে ওঠে মন। কিঞ্চিত স্বাচ্ছন্দ এবং মুক্তি লাভের আশায় সীমা জড়িয়ে পড়ে রুবেলের সঙ্গে ভালোবাসায়। ভালোবাসার অপ্রতিরোধ্য দাবি মেটাতে গিয়ে বিয়েটা হয়ে ওঠে অত্যাবশ্যক। পরিবারের অমতে বিয়ে করে ফেলে সীমা আর রুবেল। একটা মেয়ের জন্য বিয়ে যেন ভয়ানক এক যুদ্ধ কিংবা প্রলয়। স্বার্থ এবং সুবিধার অনেক কিছুর যোগ বিয়োগ। বিয়ের পর জীবনের পরিবর্তন আরো বিস্মিত করে তোলে সীমাকে। স্বামীর প্রতি গভীর আস্থা দাবি এবং অধিকারের ধারণা বিবর্ণ হতে থাকে। একজন নারীর জীবনে তার স্বামীর চেয়ে আপন আর কেউ হয় না। কিন্তু সেই মানুষটি আপন হয়েও যেন আপন নয়। কেন যেন একে অপরের কাছে দূরে থাকে দূরে সরতে থাকে। স্বামীকে কাছে টেনে আপন করতে পারে না কিছুতেই। কলিং বেল বাজে, দরজা খুলে দেখে রুবেল এসছে। সীমার অনুযোগ, রুবেল তোমার জন্য অপেক্ষায় থাকি কখন তুমি আসবে। রুবেলের সংক্ষিপ্ত উত্তর, কেন আমি তো আসি। সীমা বলে, হ্যাঁ তুমি আসো। বাচ্চা আর আমাকে অপেক্ষা থাকতে হয় কখন তুমি আসবে। রুবেল বলে, দেখো সীমা এ কথা বলে আমার মনে কষ্ট দিও না। আমি তোমাকে ছেড়েও দিচ্ছি না তোমার থেকে দূরে যাচ্ছি না। আমার মা তোমাকে মেনে নেয় নি, আমি কী করব! সীমা আর কথা বাড়াতে চায় না।
ঠিক আছে তুমি ফ্রেশ হও আমি খাবার দিচ্ছি। খাবার শেষ হওয়ার পর সীমা বলে, রুবেল আমাকে একবার তোমার মায়ের কাছে নিয়ে যাও। আমি তাকে মা বলে ডাকবো। আমার না খুব ইচ্ছা করে মা ডাকতে। মনে হয় আমি কত জনম জনম মা ডাকি না। আমি তাকে মা ডেকে আমার আত্মা জুড়াতে চাই। আর চাই তার সেবা করতে।
রুবেল বলে, তোমার কথা গুলো আবেগের কথা। আবেগ দিয়ে কোন কিছু হয় না। তুমি জানো আমার মা তোমাকে পছন্দ করে না। তোমাকে দেখলে সে উত্তেজিত হয়ে যাবে। একটা অশান্তি হবে। আমি চাইনা কোন অশান্তি সৃষ্টি করতে।
ঠিক আছে রুবেল তুমি শান্ত হও। আমি আর বলবো না কিছু, তোমাদের বাড়ি আমাকে নেও বা না নেও। বাচ্চাকে অন্ততপক্ষে তার দাদির কাছে নিও।
আবার শুরু হলো তোমার দাবী? এই দাবি দাবা বন্ধ করো। সীমা সীমাহীন ক্ষোভ বুকে চেপে রেখে নিশ্চুপ থাকে। এছাড়া কোন উপায়ও নেই।
সীমার বাপের বাড়ি এখন এক প্রকার শূন্য। সীমার বাবা মায়ের মৃত্যু হয়েছে অনেক আগে। ভাই সজীব ছাড়া আপন বলতে কেউ নেই। সেই ভাইয়ের কপালে একদিন ঘটে মহাবিপর্যয়। সজীব বোনের বাসায় আসতে গিয়ে রোড এক্সিডেন্ট করে। পথচারীরা সজীবকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। খবর শুনে সীমা ছুটে হাসপাতালে। তার ভাইয়ের পা সাংঘাতিকভাবে ভেঙ্গে গেছে। পাটা হয়তো কেটে ফেলে দিতে হবে। সীমা চিৎকার করে কেঁদে, হায় আল্লাহ একি হলো! দুনিয়াতে আছে একমাত্র ভাই সেই ভাইয়ের এই অবস্থা। কী উপায় করি। তুমি পথ দেখাও খোদা। সীমা ডাক্তারের কাছে ভাইয়ের অবস্থা জানতে চায়। ডাক্তার বলেন, পা রাখতে হলে টাকার প্রয়োজন। সীমা টাকার কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে যায়। সে টাকা পাবে কোথায়! তার কাছে তো কোন টাকা নাই। চিন্তা করে একটু আশার আলো দেখতে পায়। তার স্বামী যথেষ্ট অর্থ বিত্তের মালিক। এই দুঃসময়ে নিশ্চয়ই তার পাশে দাঁড়াবে। সীমা স্বামীর অফিসে যায়। রুবেল, আমার ভাই এক্সিডেন্ট করেছে। এখন ডাক্তার বলছে অনেক টাকার প্রয়োজন পা ঠিক রাখতে হলে। আমার ভাইয়ের যে অবস্থা, এত টাকা তার পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব নয়। এই দুঃসময়ে সময় প্লিজ তুমি ওর পাশে দাঁড়াও। রুবেল বলে, আমি টাকা পাব কোথায়? আমার হাতের অবস্থা এখন ভালো না। তুমি আমার কাছে কান্নাকাটি না করে অন্য ব্যবস্থা করো। তোমার ভাইকে বলো টাকা তার শ্বশুরবাড়ি থেকে আনতে।
সীমা বলে, তাদের অবস্থা এমনি ভালো না তারা দিবে কই থেকে? তাদের তেমন কিছু নাই যে তারা টাকা দিতে পারব। রুবেল আমি তোমার কাছে আমার ভাইয়ের জন্য ভিক্ষা চাইছি। রুবেল ধৈর্য রাখতে পারেনা, চরম কথাটি বলে ফেলে। আমি ভিক্ষা দেওয়ার জন্য টাকার থলি নিয়ে বসি নেই। এমনিতে আমার মা তোমাকে ডিভোর্স দেওয়ার কথা বলছে! তুমি বেশি কথা বললে আমি আমার মার কথা শুনতে বাধ্য হবো।
সীমা এতটা শুনবে আশা করিনি। কথাগুলো উত্তপ্ত শলাকার মতো বিদ্ধ হলো তার বুকে। ঠিক আছে রুবেল, আমাকে তুমি স্বামীর অধিকার থেকে বিমুখ করো না। আমার একটা বাচ্চা আছে, বাচ্চাটাকে অন্তত পিতৃ স্নেহ থেকে বঞ্চিত করো না। আর যাই করো তুমি আমাকে ডিভোর্স দিও না।
চারিদিকে বিরান শূন্যতা। নির্ভর করার মতো কোথাও কেউ নেই। নিরুপায় কান্নায় বুক ভেসায়। হঠাৎ এক কান্ড করে বসে সে। পাশের ফ্ল্যাটে শিমুল সাহেব থাকে। চলাচলের পথে সৌজন্য বিনিময় হয়েছে। সীমা ঠিক করে তার কাছে টাকা চাইবে। সংকোচ ঝেড়ে ফেলে বলে, ভাই আমাকে একটু সাহায্য করেন? আমার ভাইটা এক্সিডেন্ট করেছে এখন হাসপাতালে। ওর পায়ের চিকিৎসা করাতে না পারলে পাটা কেটে ফেলতে হবে! চিকিৎসা করতে টাকার প্রয়োজন। সুন্দরী সীমার প্রতি অনেকদিন ধরেই শিমুলের দৃষ্টি ছিল। সে এই সুযোগ কাজে লাগাতে চায়। আমি আপনাকে টাকা দিতে চাই। তার জন্য যে আমার একটা কথা শুনতে হবে। সীমার মাথা ঠিক নাই। সে বলে, আমাকে টাকা দেন পরে আপনার কথা শুনবো। আগে আমার ভাইয়ের চিকিৎসাটা করাই। সীমা টাকা নিয়ে যায়। ভাইয়ের চিকিৎসা হয়।
সজীবের পা ভালো হওয়ার পর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। বোনা তোর কারণে আমার চিকিৎসা হলো। তোর কাছে আমি চিরঋণী। সীমা ভাইকে বলে, ধুর পাগল বোনের কাছে ভাইয়ের কিসের ঋণ!
শিমুল অপেক্ষায় ছিল একদিন সীমাকে বলে, আমি তো তোমার উপকার করলাম। এবার তুমি আমার দিকটা দেখো। সীমা বলে, হ্যাঁ আপনার টাকাটা আমি যেভাবে পারি দিয়ে দেবো। শরীরের রক্ত বিক্রি করে হলেও আমি পরিশোধ করব আপনার টাকা। শিমুল ভুরু কুঁচকে বলে, তোমার গায়ের রক্ত বিক্রি করতে হবে না, এটা তো সহজ ব্যাপার। তুমি আমাকে খুশি করো। তাতেই আমি খুশি হবো। তোমার কাছে আমি ভালোবাসা চাই। সীমা বলে, আপনাকে আমি ভালোবাসি কী করে? আমার ভালবাসা তো স্বামীর কাছে বন্ধক দেওয়া। আমি আমার স্বামীকে ভালোবাসি। তাকে ছাড়া আমি আর কাউকে ভালোবাসতে পারবো না। তবে হ্যাঁ আপনি আমার দুঃসময়ে উপকার করেছেন যা আপনজনও করে না। আপনার সীমাহীন মহানুভবতার জন্য বিধাতা আপনার মঙ্গল করবেন। আপনার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা আর অনেক শ্রদ্ধাবোধ।
আমি শ্রদ্ধাবোধ দিয়ে কী করব? আমি তোমাকে একান্তভাবে পেতে চাই।
কাউকে বিপদকালে উদ্ধার করে বিনিময়ে তার সর্বনাশ করতে চান? হায়রে উপকার! শিমুল বিরক্ত হয়ে বলে, সহজ বিনিময়ে ঋণশোধের উপায় দেখলাম। সেটা তোমার ভালো লাগলো না আমার টাকা ফেরত দিয়ে দাও। সীমা বলে, ঠিক আছে আপনার টাকা আমি ফিরিয়ে দেবো। ঝোঁকের মাথায় কথাটা বলে কিন্তু তার কোন কুল কিনারা দেখতে পায় না। রক্ত বিক্রির চেষ্টা করে, তাতে আসে সামান্য কিছু টাকা। বিশাল ঋণের তুলনায় তা একেবারেই অপ্রতুল। কয়েকবার রক্ত দেয়ার পর রক্ত আর নিতে চায় না। যেখানে যায় সেখান থেকে বলা হয়, যে পরিমাণ রক্ত আছে সেটা আপনার শরীরেই প্রয়োজন। এই শরীরে রক্ত দিলে আপনি বাঁচবেন না! স্বামীর প্রতি সীমার অনেক অভিমান। স্বামীর টাকা আছে কিন্তু সে টাকায় স্ত্রীর কোন অধিকার নাই। সীমা বলে, রুবেল তুমি আমার স্বামী তারপরও আপন ভেবে একটা অধিকার খাটাতে পারি না। হয়ে আছি তোমার পাপেট স্ত্রী বা নামমাত্র স্ত্রী। তুমি কিন্তু তোমার স্বামীত্ব ফলাচ্ছ পুরোপুরি। রুবেলের প্রতি উত্তর, কী বলছো তুমি এসব? তোমার ভরণপোষণ আমি ঠিকই দিয়ে যাচ্ছি। আর কী চাই তোমার? সীমা চাপা ক্ষোভ দমন করে বলে, হ্যাঁ তুমি বহুত দায়িত্ব পালন করছো। খাওন পড়ন দিচ্ছ এটাই বা কম কিসের?
সীমা নিজের সঙ্গে অনেক যুদ্ধ করে। কী করবে এখন। শিমুল সাহেবের দেনা পরিশোধের সামর্থ্য নিকট ভবিষ্যতে দেখছে না। স্বাবলম্বী হবার সমস্ত পথ রুদ্ধ করে নারীর অস্তিত্বটা পৃথিবী যেন পরনির্ভর করে রেখেছে। ঋণের বোঝার মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে সে নিঃশেষ হয়ে যেতে থাকে। শিমুল সাহেবের কথিত সহজ সমাধান তার কাছে মৃত্যু সমতুল্য। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের আত্মপীড়নে দগ্ধ হয় সীমার মন। সে উদ্ভ্রান্তের মতো ভাবতে থাকে।
সীমা ভাইয়ের কাছে যায়। হাসতে হাসতে বলে, সজীব আমি না থাকলে তুই আমার বাচ্চাটাকে দেখে রাখতে পারবি না? সজীব বলে, আপা তুমি এসব কী বলছ? সীমা বলে, আরে পাগল আমি যদি না থাকি আমার বাচ্চাটার কী উপায় হবে?
তুমি যদি না থাকো মানে? তুমি কি কোথাও যাচ্ছ?
না আমি কোথায় যাব। বললাম কথার কথা। তুই তো বাচ্চার মামা। ওকে দেখে রাখতে পারবি না? সজীব দৃঢ় কন্ঠে বলে, খুব পারবো। সারা জীবন পারবো। মামা ভাগ্নে যেখানে আপদ নাই সেখানে।
ভাইয়ের মৃদু রসিকতা উপভোগ করে সীমা। বাচ্চাকে বুকে টেনে নিয়ে আদর করে। আদরের চেয়ে মামার সান্নিধ্য বেশি পছন্দ, বাচ্চা মামার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সীমা শান্তি পায়। বাচ্চাকে ভাইয়ের কাছে রেখে সে বেরিয়ে পড়ে। আত্মপীড়ন থেকে মুক্তির দুটি পথ খোলা তার সম্মুখে। একটি আত্মসমর্পণ অপরটির আত্মহনন। দুটিই মৃত্যু, ভাবে কোন মৃত্যুটি বেছে নেবে। সে দ্বিতীয়টা বেছে নেয়।
