
নাহার সাদামাটা ধরনের নারী। সাজগোজ করতে তার ভালো লাগে না। বাহুল্য হীন এক জীবন। স্বামী জাবেদের মনে এটা নিয়ে বড় আক্ষেপ। তিনি বারবার ভাবেন, বাবা-মা কেন এমন একজনকে তার সঙ্গে বিয়ে করালেন? একে নিয়ে কি সংসার করা যায়? দেখতে নারী চলন বাঁকা। নাহারের সামান্য কথাতেও রেগে উঠেন জাবেদ। বলেন, “তোর কথা শুনলে গা জ্বালা করে! তুই আমার পছন্দের না! তুই আমার সামনে কোন কথা বলবি না”।
নাহার মিনতি করে বলেন, “আপনি এখন চার সন্তানের বাবা, এখনো আপনার মন-মেজাজ ঠিক হয় না। আমি আপনার মন মতো হতে চেষ্টা করি, কিন্তু…” জাবেদের কঠিন স্বরে নাহার কথা শেষ করতে পারে না। “তোর চেষ্টায় কাজ হবে না। আমি আবার বিয়ে করবই!” সমাজের চোখে “পুরুষত্ব” প্রমাণের বাতিক বুঝি তাকে চেপে ধরেছিল।
নাহার ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে, “আমার কী হবে? সন্তানদের কী হবে?” জাবেদ ঠাণ্ডা মাথায় উত্তর দেন, “সন্তানের দায়িত্ব আমার। এসব নিয়ে তোর ভাবনার দরকার নেই।”
জাবেদ নতুন বিয়ের প্রস্তুতি নিয়ে কনে দেখা শুরু করেন। নাহার খোঁজখবর রাখেন। সুযোগ পেয়ে মেয়ের বাড়িতে গিয়ে সব প্রকাশ করে দেন। মিনা বাবা দুলাল সাহেব। এমন কথা শুনে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, “জাবেদ তো বলেছিল তার স্ত্রী মারা গেছে! এটা কেমন ধোঁকাবাজি!” মিনাও প্রত্যাখ্যান করে বলেন, “এমন অসৎ মানুষকে বিয়ে করার প্রশ্নই ওঠে না। তুমি কোন চিন্তা করো না বোন”।
নাহার কৃতজ্ঞতায় মিনার হাত চেপে ধরে, “তুমি নারী হয়ে নারীর ব্যথা বুঝেছ। আল্লাহ তোমাকে ভালো রাখুক।”
বিয়ে ভন্ডুল হয়ে যাওয়া জাবেদ খুব ক্ষেপে যায়। বাড়ি ফিরে জাবেদ নাহারের গায়ে হাত তুলে, “তুই আমার বিয়ে ভেঙে দিলি কেন? এত সাহস তোর!” নাহার অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকে, “আমি কী করব? আপনি তো আমার কোন কথা শুনছেন না”
নাহার উপায়ান্তর না দেখে জাবেদের অফিসে গিয়ে অভিযোগ করেন। বস মিলন সাহেব সহানুভূতি দেখান। চেষ্টা করেন পরিবারের সংঘাতের অবসান ঘটাতে। সত্যতা যাচাই করে জাবেদকে ধমক দেন, “বিয়ে বন্ধ করো নইলে চাকরি চলে যাবে!” জাবেদ আতঙ্কিত হয়ে বসের কথা মেনে নেয়। নাহারকে বলেন, “তুই জিতেছিস কিন্তু আমার মন তুই কখনো পাবিনা।”
জাবেদ কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়ে। চিকিৎসায় কাজ হয় না। দ্রুত অবস্থার অবনতি হতে থাকে। মৃত্যুশয্যায় নাহারের সেবায় মুগ্ধ হয় জাবেদ। এই অবস্থায় কেউ সাজগোজ করে তবু নাহার সেদিন একটু পরিপাটি হয়ে হাসপাতালে এসেছিল। জাবেদ অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। মনে মনে ভাবে আজ এত সুন্দর লাগছে কেন তার বউটাকে। জাবেদ বুঝতে পারে তার সময় শেষ হয়ে এসেছে। সব মৃত্যু পথযাত্রীদের কি এমন হয়? জাবেদ নাহারকে ইশারায় কাছে ডাকে। রুগ্ন হাতে নাহরের হাত দুটি জড়িয়ে ধরেন। বলেন, “তোমাকে সুন্দর লাগছে”। নাহারের চোখ ছল ছল করে ওঠে। জাবেদের চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। নাহার শাড়ির আঁচলে জাবেদের অশ্রু মুছে দিয়ে কপালে চুমু দেয়। জাবেদ কাঁদতে কাঁদতে নাহারের হাত চেপে ধরে বলেন, “আমি তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি আমাকে মাফ করে দিও।” নাহার স্বামীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেন, “আপনি শুধু সুস্থ হোন। আর কিছু চাইনা আমার”। জাবেদ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগে বলেন, “তুমি আমাকে ভালোবাসা শিখিয়ে দিলে”।
