oplus_2080

ছোটগল্প “অবহেলা”

author
0 minutes, 24 seconds Read

নাহার অনেক স্বপ্ন নিয়ে জীবন শুরু করেছিল। আশা ছিল স্বামী সংসার নিয়ে এক পরিপূর্ণ জীবন হবে তাঁর। স্বামীর আকস্মিক মৃত্যুর পর জীবনের চিত্র ধীরে ধীরে পাল্টে যেতে থাকে। নাহার জীবনের পুরোটাই স্বামী সন্তানদের জন্য উৎসর্গ করেছেন। কিন্তু আজ বৃদ্ধ বয়সে কেউই তাঁর খোঁজ রাখে না। তাঁর চার সন্তান ফয়সাল, রাকিব, লতা ও মিলি—সবাই বিয়ে করে আলাদা সংসার পেতেছে। প্রত্যেকেরই স্বচ্ছল অবস্থা, বড় বাড়ি, গাড়ি, কিন্তু তারা কেউই মাকে নিজের সাথে রাখতে রাজি নয়। নাহারকে ঠাঁই দেওয়া হয়েছে বাড়ির পিছনের একটি অন্ধকার, ভাঙাচোরা ঘরে।
নাহারের স্বামী সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর কিছু পেনশন পেতেন। মৃত্যুর আগে তিনি সন্তানদের বলেছিলেন, “এই টাকা তোমাদের মায়ের দেখভালের জন্য খরচ করো।” কিন্তু তার মৃত্যুর পরই ছেলে-মেয়েরা টাকাটা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া শুরু করে। নাহারকে কেউ জিজ্ঞেসও করে না। মাঝেমধ্যে লতা বা মিলি এসে বলে, “মা, আমাদের এখন অনেক খরচ, কিছু টাকা দিতে পারবে?” নাহার চুপ করে যা আছে তাই দিয়ে দেন। তাঁর মনে কোনো অভিমান নেই, শুধু একটা নীরব ব্যথা সন্তানরা তাঁকে ভুলে গেছে।
দিন যায়, নাহারের শরীর ভেঙে পড়ে। প্রথমে শক্তিহীনতা, তারপর জ্বর, কাশি, অবশেষে তীব্র ব্যথা। তিনি ডাক্তার দেখান, পরীক্ষা-নিরীক্ষায় জানা যায় তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত। চিকিৎসা সম্ভব, কিন্তু খরচ অনেক। নাহারের মনে সান্ত্বনা, “আমার সন্তানরা তো আছে, ওরা আমাকে সাহায্য করবে।”
তিনি প্রথমে বড় ছেলে ফয়সালকে ডাকেন। ফয়সাল উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, তার বিলাসবহুল জীবন। নাহার কাঁপা গলায় বলেন, “বাবা, ডাক্তার বলেছে আমার ক্যান্সার হয়েছে, চিকিৎসা করাতে হবে…” ফয়সাল কথাটা শেষ হতে না দিয়েই বলে, “মা, আমার এখন বাচ্চাদের স্কুল ফি, গাড়ির ইএমআই এমনিতেই টানাটানি। তুমি বুঝো না কী অবস্থা!” নাহার নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকেন, তারপর মাথা নেড়ে বলেন, “ঠিক আছে, বাবা।”
তারপর তিনি রাকিব, লতা ও মিলিকে বলেন। রাকিব বলে, “মা, আমার ব্যবসায় লোকসান চলছে।” লতা বলে, “আমার স্বামী টাকার ব্যাপারে রাজি হবে না।” মিলি তো মুখই ফিরিয়ে নেয়। নাহার বুঝে যান, তার জন্য কেউ কিছু করবে না। তিনি নীরবে ফিরে আসেন নিজের ভাঙা ঘরে।
দিনের পর দিন রোগ যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকেন। ব্যথা সহ্য করতে করতে এক রাতে নাহার চিরতরে চোখ বন্ধ করেন। কেউ জানতেও পারে না। পরের দিন সকালে পাশের বাড়ির একজন মহিলা নাহারের দরজায় ডাক দেন, কিন্তু কোনো সাড়া না পেয়ে ছেলে-মেয়েদের খবর দেন।
সন্তানরা এসে দেখে মা বিছানায় শান্ত হয়ে শুয়ে আছেন, যেন ঘুমিয়ে আছেন। মায়ের মৃত্যু নিশ্চিত হলে তাদের চোখে অশ্রু ঝরে। ফয়সাল কাঁদতে কাঁদতে বলে, “মা, আমরা তোমাকে চিকিৎসা করালাম না… শুধু টাকার কথাই ভেবেছি!” রাকিব মাথা চাপড়ায়, “মা, তুমি চলে গেলে? আমরা এতই নির্দয় ছিলাম!” লতা ও মিলি মায়ের শীতল হাত ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। কিন্তু মৃত মানুষ কি আর ফিরে আসে?
নাহারের সন্তানদের হৃদয় হয়তো দগ্ধ হয়, কিন্তু মায়ের জন্য তাদের এই অনুশোচনা বৃথা। কারণ মায়ের জন্য তারা কিছুই করতে পারেনি। টাকাকেই বড় করে দেখেছে। মা তুমি আমাদের ক্ষমা করো।” প্রতিবেশীরা বলাবলি করে, “টাকার লোভে মাকে মেরে ফেলেছে।”
জীবনে এমন অনেক কিছুই আছে, যার মূল্য আমরা তখনই বুঝি যখন তা হারিয়ে যায়। মা-বাবা,পরিবার এদের ভালোবাসা, তাদের প্রয়োজনীয়তা আমরা অনেক সময় উপলব্ধি করি না। কিন্তু যখন সময় চলে যায়, তখন শুধু অনুতাপই থাকে। যে একবার পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়, সে আর ফিরে আসে না। তাই সময় থাকতে আমাদের মানুষ কে মূল্য দেওয়া উচিত। নাহারের জীবন আমাদের সেই কথাই মনে করিয়ে দিয়ে গেল।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *