“সমানে সমান নয়”

author
0 minutes, 48 seconds Read

আসমা মাটির চুলা ঠিক করছিল। শিপন বলে, মা মামা বাড়ি যাবা? তারা তো রোজ কত কী রান্না করে! কত মানুষ খাওয়ায়! সেখানে গেলে আমরাও ভালো-মন্দ খেতে পারব। ছেলের কথা শুনে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আসমা। মা কিছু বলছ না কেন? যাব বাবা, তবে আজ নয়, অন্য দিন। মা আজকেই চলো না। বাবা হাতে মেলা কাজ। কাজ ফেলে কী করে যাই? ছেলে আবার অনুযোগ করে, তোমার কাজ সারতে গেলে যাওয়াই হবে না। মা বলে, ঠিক আছে যাব একটু গোছ গাছ করে নেই। আসমা কাজ শেষ করে ছেলেমেয়েকে প্রস্তুত করে বাপের বাড়ি যায়। গিয়ে দেখে, ভাই ফয়সালের শ্বশুরবাড়ি থেকে অনেক লোক এসেছে। ভাই আর ভাবি মুন্নি সেই মেহমানদের নিয়ে ব্যস্ত। আসমা ছেলেমেয়ে নিয়ে এক কোণে বসে থাকে। কেউ খেয়ালই করে না।
শিপন বলে, মা, সবাই তো খাচ্ছে। আমাদের খেতে দেবে না? আসমা ভাবে, যেখানে আমাদের উপস্থিতিই চোখে পড়ে না, সেখানে খাবারের খেয়াল কে রাখবে? মেয়ে ছোট, বুকের দুধেই চলে। ছেলে ক্ষুধায় কাতর। আসমা ভাবির কাছে গিয়ে বলে, ভাবি, আমার শিপনকে একটু ভাত দাও। মুন্নি চোখ তুলে, তুই আবার এসেছিস কখন? খাবারের গন্ধ পেয়ে চলে এসেছিস?
আসমা মনে মনে বলে, আমার বাপের বাড়ি, আমার হক নেই। ভাবির বাপের বাড়ির লোকদের জন্য মাছ-মাংসের আয়োজন, আর আমার ছেলের ভাত দিতে অনার কষ্ট হয়!
শিপনের মন খারাপ হয়ে যায়। খাবার শেষে মুন্নি বলে, আসমা, আয় খেয়ে নে। আসমা ছেলেকে নিয়ে বসে, কিন্তু কিছুই জোটে না। তরকারির পাতিল থেকে একটু ঝোল দেয়। শিপন বলে মা, আমাদের তো মাছ-মাংস কিছুই দিল না। থাক বাবা, এ দিয়েই খাও।
বিকেলে ফয়সাল স্ত্রী মুন্নি কে বলে, সবাইকে ফল কেটে দাও। মুন্নি ফল কাটতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল, আর ফয়সাল আনন্দ নিয়ে ফল খেতে বসে। এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট শিপন তার মামাকে জড়িয়ে ধরে বলল, মামা, মামা আমাকে একটু ফল দাও। মামা সে তার শ্বশুরবাড়ির মানুষ নিয়ে ব্যস্ত। ফয়সাল অবহেলার কন্ঠে বলল, আহ, পোলাপান! যাও তোমার মামির কাছে। মুন্নি বলে, ওদের পরে দিব। শিপনের ছোট্ট হাতে ফলের টুকর ধরবে কিন্তু স্পর্শ করার আগেই থেমে গেল। মামি মুন্নি তাকে ধমক দেয়। শিপন আর ফল ধরে না সে আটকে গেল।
আসমা তখন নিচু গলায় আপন মনে বলে উঠল, আজ যদি আমার অবস্থা ভালো হতো, তাহলে আমারও কদর থাকত।
মানুষ তখনই কদর করে, যখন সমানে সমান হয়।
গরিবের দিকে কেউ কখনও নজর দেয় না…”!
প্রতিদিনই ভালো খাবার রান্না হয়, কিন্তু আসমা ও তার ছেলের কপালে কিছুই জোটে না। মুন্নি বলে আসমাকে, আজ থাক, রান্না করি, ছেলেকে নিয়ে খাস। আসমা ভাবে, আজ হয়তো ছেলের পাতে মাছ-মাংস উঠবে। রান্না শেষ হলে ছেলেমেয়ে গোসল করিয়ে খাবারের কাছে যায়। মুন্নি বলে, তোরা পরে খাস। আসমা ছেলেকে আশ্বস্ত করে, থাক বাবা, একটু পরেই খাব।
শেষে মুন্নি ডাকে, আসমা, আয় খেতে। আসমা গিয়ে দেখে, ভাত আছে, তরকারি নাই। ভাবি, তরকারি কই? শেষ হয়ে গেছে। ডাল দিয়ে খেয়ে নে। আসমার রাগ হয়! ভাইয়ের কাছে গিয়ে বলে, তুমি কেমন ভাই? তোমার বোনের কোনো গুরুত্ব নেই। সব লক্ষ তোমার শ্বশুরবাড়ির মানুষের দিকে। এই বাড়ি আমার হক নেই, আছে শুধু তোমার শ্বশুরবাড়ির মানুষের। মুন্নি ক্ষেপে যায়, আমার বাপের বাড়ির মানুষ নিয়ে কথা বলছ? বলবো না? আমি কয়দিন ধরে আছি, আমার ছেলের পাতে কিছু ওঠে না!
ফয়সাল বলে, আমার মান-ইজ্জত খাইস না। আসমা বলে, তখনই মান-ইজ্জত যায়, যখন আমি কিছু বলি? আমি কী খাইলাম, কী পরলাম, তা নিয়ে ভাবো না! আসমা, তুই থাম! ফয়সাল কঠোর কণ্ঠে বলে।
আসমার কণ্ঠে অটল দৃঢ়তা, না, আমি থামবো না। আমি এতিম সন্তান নিয়ে এসেছি এই বাড়িতে। সেই সন্তানদের জন্য কারও মনে সামান্যটুকু মায়াও নেই। তোমাদের মাছ-মাংস, আনন্দ আর দাওয়াত—সব থাক তোমাদের জন্য। খাওয়াও তোমার শ্বশুরবাড়ির মানুষদের। বোনের কোনো দাম নেই তোমার কাছে। এমন সময় ছোট শিপন মায়ের পাশে এসে দাঁড়ায়। তার কণ্ঠ ভাঙা, গলা শুকনো মা, মা… আমি ভাত খাব না? আসমা সন্তানের মাথায় হাত রেখে বলে, না বাবা, আর না। চল, আমরা বাড়ি ফিরি। মরবো বা বাঁচবো, থাকবো নিজের ঘরে—স্বামীর বাড়ি। চোখের কোণে অশ্রু নিয়ে, বুকভরা অভিমান নিয়ে আসমা সন্তানদের নিয়ে স্বামীর বাড়ি চলে যায়। নিজের ঘরে ফিরে সে রান্না করে, নিজে হাতে ছেলের মুখে ভাত তুলে দেয়। যা জোটে—লবণ পানি, তাই-ই সে সন্তান নিয়ে ভাগ করে খায়। মনে মনে বলে, অন্যের উপর ভরসা করে বাঁচা যায় না। নিজের বলেই বল। একজন নারীর শক্তি—তার স্বামী। সেই বাড়ি তার আসল ঠিকানা।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *