
জামিলা নিঃসন্তান। দেবরের সন্তান হামিদকে কোলে পিঠে করে বড় করেছেন। হামিদ তাঁকে মা বলে ডাকে। জানে, জামিলা তার জন্মদাত্রী মা নন, তবু মা বলে ডাকা যেন তার হৃদয়ের প্রশান্তি। জামিলা বলেন, হামিদ আমার গর্ভজাত সন্তান নয়, কিন্তু ওর আচরণে কখনো বুঝতেই পারি না ও আমার সন্তান নয়। আমার ওর জন্য অনেক অনেক ভালোবাসা। জামিলা মনে মনে ভাবেন—যাক, নিজের গর্ভে সন্তান না হলেও, হামিদ-ই আমার সন্তান। তবে, তিনি সম্পত্তি দেওয়ার ব্যাপারে কঠোর। বলেন, সব এখন দিলে ওর বউ আসলে তার কাছে সম্মান আর কদর থাকবে না কারণ সম্পত্তি তো আগেই পেয়ে গেছে। আজকাল তো আপন শাশুড়ির কদর নেই, আমি তো চাচি শাশুড়ি! আমি আমার সব সম্পদ নিজের হাতেই রাখব। বউ যদি আমার আর হামিদের মাঝে ফাটল ধরায়, তবে ওই মেয়েকে আমি এ বাড়িতে রাখব না। তিনি চান, ছেলে বিয়ে করুক ঠিকই, কিন্তু সংসারের রাজত্ব থাকবে তাঁর হাতে। অবশেষে, জামিলা হামিদের বিয়ে কারণ। হামিদের বিয়ের প্রথম থেকেই জামিলা সংসারের নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতে রাখেন। নার্গিসকে বলেন, আমি গুরুজন, আমার কথা মান্য করলেই আশীর্বাদ পাবে। আমি যদি বলি এখন রান্না করবা তখন রান্না করবা, যদি বলি এখন ঘুমাবা তখন ঘুমাবা, আমি যখন যেইটা বলবো তখন তা শুনবা, সব আমার হুকুমে চলবা।

হামিদ নিরুত্তর। নার্গিস হাসিমুখে হ্যাঁ বলে। কিন্তু বিয়ের পর থেকেই সংসারের কাজকামের দায়িত্বভার পুরোপুরি নার্গিসের কাঁধে। বিশ্রামের সময় মেলে না, স্বামী পাশে থাকলেও আশ্রয় মেলে না। বাবার বাড়ি যাওয়ারও অনুমতি নেই। জামিলা বলেন, সংসারের কাজ সব বউ-ই করবে। আমি তো অনেক করেছি, এখন বিশ্রাম নেব। নার্গিস ভাবে—স্বামীর কাছ থেকে কিছু না পেলেও, সন্তান হলে তখন তাকে দিয়ে স্বপ্ন পূরণ করব।
নার্গিসের কোল জুড়ে আসে সন্তান। জামিলা খুশি—সে নাতিকে খুব ভালোবাসে। কিন্তু শাশুড়ির কর্তৃত্ব কমে না। ক্ষুধার্ত নার্গিস খাবার বেড়ে খেতে ছিল। তা দেখে জামিলা রেগে যান,
তুমি আমার হুকুম ছাড়া খেতে বসলে কেন? স্বামীকে নার্গিস বলে, তোমার চাচি আমাকে মানুষ ভাবেন না।
হামিদ বলে, চাচি আমায় কোলে-পিঠে মানুষ করেছেন। আমি তাঁর বিরুদ্ধে কিছু বলতে পারব না। নার্গিস বুঝে যায়, এই সংসারে নিজের মতো করে বাঁচার সুযোগ নেই। সে চুপচাপ, মন খারাপ করে বসে আছে। চোখে অশ্রু নেই, বুকের ভেতরটা কাঁদছে। হামিদ পাশে এসে বসে বলল, মন খারাপ করো না। আমার চাচি একটু এরকমই, রাগ বেশি। পরে দেখবে ঠিক হয়ে যাবে।
নার্গিস শান্ত গলায় বলল, তোমার চাচি কখনো আমাকে মানুষ মনে করে না! এই বাড়িতে আসার পর থেকে আমি শুধু কাজের লোকের মতো খেটেই যাচ্ছি। দেখো আমি কিছু বললে তাঁর সম্পত্তি হাতছাড়া হয়ে যাবে তাই কিছু বলি না। ওদের কথোপকথন আড়াল থেকে শুনে জামিলা হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলেন, শুনছি আমি! আমার নামে কী বলা হচ্ছে? আমি খেতে দিই না, পড়তে দিই না—এইসব? আর আমার সম্পত্তির লোভে তুই আমাকে কিছু বলিস না।
হামিদ দৌড়ে কাছে গিয়ে বলল, থামেন মা, আমি নার্গিসকে বুঝিয়ে বলছি। ও যাতে আপনার উপর রাগ না করে, তাই বুঝিয়েছি। আসলে আপনার সম্পত্তির কথাও তুলেছি, যাতে ও ভয় পায়।
জামিলা এবার ফুঁসে ওঠেন, হ্যাঁ রে, এখন চিনলাম তোর মুখোশ। তুই আমারে ভালো কস শুধু সম্পত্তির আশায়! হামিদ গলা নামিয়ে বলে, মা, আপনি রাগ করবেন না। আমি ওকে বুঝিয়ে। নার্গিস চুপ হয়ে আছে। সে বুঝে যায়, এই বাড়িতে তার জন্য ভালোবাসা বা সম্মান কিছুই নেই। আছে শুধু সম্পত্তি নামক একটা হাতিয়ার, যার কাছে সে বন্দী। আমার কোনো কথা চলবে না, কারণ আমার কাছে কিছু নেই।
নার্গিস তিন ছেলের মা। ছেলেরা যখন দৌড়ে এসে মায়ের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন নার্গিসের বুকটা ভরে যায়। সে ভাবে, স্বামীর থেকে সুখ না পাইলেও, ছেলেদের ভালোবাসা দিয়েই বুকটা জুড়িয়ে নিব।
ছেলেরা এখন বড় হয়েছে। নার্গিস মনে মনে ভাবে, এবার ওদের সংসার গুছিয়ে দিতে হবে। ওদের জন্য এমন জীবন চাই, যেন আমার মতো কষ্টে না থাকতে হয়। এক সন্ধ্যায় স্বামী-স্ত্রী বসে কথা বলছে। নার্গিস স্বামীকে জিজ্ঞেস করে, ছেলেরা তো এখন বড় হয়েছে, বিয়ে করানো দরকার। তুমি কী ভাবছো? হামিদ একটু থেমে বলল, আমি তো তোমার কোনো চাওয়া পূরণ করতে পারিনি, তাই এবার ছেলের বিয়ে তুমি তোমার পছন্দ মতো করাও। যেন সেই মেয়ে তোমার কথা শোনে, তোমায় সম্মান করে। নার্গিসের চোখে আনন্দের ঝিলিক। তার মনে হয়, অবশেষে তার জীবনে কিছুটা সম্মান ফিরছে। সে স্বপ্ন দেখে, বউ তার মনের মতো হবে, তাকে মা বলে জড়িয়ে ধরবে।
এমন সময় মুহিত কাশি দেয়। কিছুটা দ্বিধা নিয়ে বলে, মা, আমার একটা কথা ছিল। নার্গিস বলে বল বাবা কী বলবি? মুহিত এক নিঃশ্বাসে বলল,
আগামীকাল সকালে আমি ঢাকায় চলে যাচ্ছি, মা। নতুন অফিসে জয়েন করতে হবে। আমার স্ত্রীও আমার সঙ্গে থাকবে। নার্গিস চমকে যায় তোর স্ত্রী? হ্যাঁ মা, আমি বিয়ে করেছি। ছেলের কথা শুনে তার আর কিছুই বলার ইচ্ছা জাগে না। সে স্তব্ধ। ঘরে একটা অদৃশ্য শূন্যতা নেমে আসে। হামিদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, তোরা এখন বড় হয়েছিস, যেভাবে ভালো মনে হয়, সেভাবেই চল বাবা।
কিন্তু জামিলা সহ্য করতে পারলেন না। রাগে ফুঁসে উঠলেন। নাতির সামনে এসে বললেন, তুই বিয়ে করলি? এখন চাকরি হইছে, ভাবছিস বাবা-মারে রেখে বউ নিয়ে থাকবি? বউ থাকবে এই বাড়িতেই। মুহিত শান্ত গলায় বলল, দাদি, আমি যেখানে থাকব, আমার স্ত্রীও আমার সঙ্গেই থাকবে। একসাথে থাকাটাই তো স্বাভাবিক! জামিলা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নেন। কিন্তু তখন নার্গিস হালকা হাঁসি দিয়ে ছেলের পিঠে হাত রেখে বলল, বাবা, তুই ঠিক বলছিস। তোর বউকে তোর কাছেই রাখিস। আমি যেরকম স্বামীর কাছ থেকে কিছুই পাইনি, কষ্টে করেছি, সবকিছু সহ্য করেছি—আমি চাই না, তোর বউও আমার মতো জীবন কাটাক। তার কণ্ঠে আবেগ, কিন্তু চোখে কঠিন এক সত্যের দীপ্তি। মুহিত স্তব্ধ হয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। সে বুঝতে পারে, মা শুধু শাশুড়ি নয়—একজন নারী, একসময় বউ ছিলেন, কষ্ট লুকিয়ে মুখে হাসি দিয়ে সংসার করেছে।

মেজো ছেলে রবিউল ব্যবসা করার জন্য মায়ের কাছে টাকা চায়। নার্গিস ছেলের চোখে আশা দেখে, একটুও দেরি না করে সঞ্চয়ের টাকা তুলে দিয়ে বলে, এই নে বাবা, তুই ব্যবসা শুরু কর মন দিয়ে। রবিউল ব্যবসা শুরু করে, ধীরে ধীরে সফল হয়। এরই মাঝে, হঠাৎ করেই একদিন খবর আসে—রবিউল বিয়ে করেছে, কাউকে না জানিয়েই। বউকে নিয়ে সে শহরের কাছেই ভাড়া বাসায় থাকে, তার ব্যবসার কাছাকাছি। শুনে আশেপাশের লোকজন নানা কথা বললেও, নার্গিস শান্ত গলায় বলে, আসা-যাওয়ার সময় অনেক লাগে। যেখানে ব্যবসা, তাই সেখানে থাকে। ছেলে রান্না করে খাবে কেন! বউ যখন আছে, তার একসাথেই থাকুক। একটু থেমে, যেন নিজের সাথেই কথা বলে, সবার বউ তাদের স্বামীর সাথেই থাকে। আমার স্বামী আমাকে শুধু সংসারের কাজ করার জন্য আনছে, কোনোদিন তো জিজ্ঞেস করেনি, তুমি কেমন আছো? নার্গিসের কোন অভিমান নেই, আছে কেবল একটা বয়স পেরিয়ে আসা নারীর দীর্ঘশ্বাস, যার যেমন কপাল, সে তো তেমনি থাকবে। স্বামী যেখানে রাখে, বউ তো সেখানেই থাকবে।
ছোট ছেলে জাহিদকে অনেক স্বপ্ন নিয়ে বিদেশ পাঠায়। নার্গিস মনে মনে ভাবে, এই ছেলে অন্তত বুঝবে। স্বামীর দিকে তাকিয়ে বলে। এই ছেলে দিয়ে যদি আশা পূরণ হতো! হামিদ মৃদু হেসে উত্তর দেয়, আশা করতে তো দোষ নেই। বড় দুই ছেলেকে দিয়ে তো পারো নাই, এখন এই ছেলেকে দিয়ে যদি পারো। কিন্তু ভাগ্য যেন নার্গিসকে আবারও পরীক্ষা নিতে চায়। বিদেশ যাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই খবর আসে—জাহিদ ফোনে বিয়ে করেছে! তার প্রেমিকাকে, ভয়ে, না পাওয়ার আশঙ্কায় তাই না জানিয়েই বিয়ে সেরে ফেলে। ছোট ছেলের এই খবর শুনে নার্গিস নিঃশব্দে বসে থাকে অনেকক্ষণ। তারপর ধীরে বলে, তিন ছেলে, এক ছেলেকেও আমি বিয়ে করাতে পারলাম না। কেউ আমার পছন্দকে গুরুত্ব দিল না। সবাই নিজের মতো বিয়ে করলো। আর আমি! আমি সারাজীবন নিজের মনটাকেই তো চুপ করিয়ে রেখেছি। তার চোখে অশ্রু নেই, মুখে ক্ষোভও নেই, শুধু ক্লান্তি। তারপর বলল, যাক, ছেলের বউরা অন্তত স্বামীর পাশে থাকতে পারছে। নিজের মতো চলতে পারছে। আমি তো পারি নাই। তবু আমি চাই—আমার ছেলেদের বউরা যেন আমার মতো না হয়। ওরা যেন ভালোভাবে বাঁচতে পারে।
জামিলার মৃত্যুতে পুরো বাড়িটা যেন নিঃশব্দ হয়ে যায়। সবাই চলে গেছে নিজের পথে। এখন বাড়িতে শুধু নার্গিস আর হামিদ। একদিন দুপুরে নার্গিস বারান্দায় মোড়ায় বসে, দূরে তাকিয়ে আছে। শুধু ফেলে আসা জীবনটাকেই মনে করে, আস্তে বলে, এই শ্বশুরবাড়িতে এসেছিলাম অনেক স্বপ্ন নিয়ে। যাক সেসব কথা আর না ভাবি। একটু থেমে আবার বলে, সবার কপালে শ্বশুরবাড়ি সুখ হয় না। আমি না পাইলে কী হবে আমার ছেলের বউরা যেন পায়। তারা যেন সুখে থাকে—এই তো আমার চাওয়া। হামিদ পাশে বসে, চুপচাপ শুনে। নার্গিসের চোখে আছে একধরনের প্রশান্তি। ঠিক তখনই বাড়ির বড় ছেলে মুহিতের ফোন আসে। নার্গিস ফোন ধরে।
মা, একটা কথা বলব?
বল বাবা।
আমার বউ বলেছে, আমরা তোমাদের কাছে কিছুদিন থাকব। বাচ্চারও স্কুল ছুটি। তোমাদের পাশে থাকতে মন চায়।
তোরা সবাই আসিস। নার্গিস ফোন নামিয়ে রাখে। তার মুখে একটা প্রশান্ত হাসি। সেই হাসির গভীরে একটা দীর্ঘ লড়াইয়ের অবসান।
