
সূর্য ওঠার আগেই আফরোজা ঘুম থেকে উঠে পড়ল। মনে তার চাপা উদ্বেগ, তবুও আত্মবিশ্বাসে বলিয়ান সে। বর্তমান কাজ থেকে ছুটি নিয়ে, তাও চায় সব রুটিন যেন ঠিক থাকে। রান্নাঘরে গিয়েই দেখে, শাশুড়ি ইতিমধ্যেই চুলা জ্বালিয়েছেন। শাশুড়ি কিছুটা বিস্মিত! বৌমা এত ভোরে তুমি উঠেছ? হ্যাঁ মা, আজ নতুন চাকরির ইন্টারভিউ দিতে যাব, আফরোজা বলে উৎসাহ নিয়ে। শাশুড়ির কপালে ভাঁজ পড়ে। বৌমা, তুমি যে চাকরিটা করছ সেটা তো ভালই? সে চাকরিতে বাড়ির সবাই খুশি। আবার নতুন করে চাকরির জন্য এত কষ্ট করে লাভ কী? আর ওই দূরের জায়গায় যাওয়া-আসা করবে কীভাবে? সংসারের দিকেও তো খেয়াল রাখতে হবে! আফরোজার মুখে জবাব আটকে গেল। সে চুপচাপ চা বানাতে থাকে। এই কথাগুলো সে কতবার শুনেছে! বাবার মুখে, ভাইয়ের মুখে, স্বামীর মুখে—তুমি পারবে না, চাকরি করা মেয়েদের কাজ না, তারা সংসার কাজে ব্যস্ত থাকবে। —এসব কথার এক অদৃশ্য দেয়াল তাকে চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে ছোটবেলা থেকেই। বর্তমান কাজটি তার যোগ্যতার অনুপযুক্ত। নিজের মধ্যে যে দক্ষতা সে গড়ে তুলেছে, তার জন্য লড়াই করবে না কেন?
কাজকর্ম সেরে যখন প্রস্তুত হচ্ছিল, স্বামী আদিল ঘুম থেকে উঠে বলল, শুনলাম তুমি আজ নতুন চাকরির ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছ? সেখানে তো পুরুষদের ভিড়। একলা যেও না। আমি সঙ্গে করে নিয়ে যাব। আফরোজা হাসল, না, আমাকে একলাই যেতে হবে। আমি পারব। আদিল চিন্তিত চোখে তাকিয়ে রইলো। বাসা থেকে বের হওয়া মাত্রই তার সম্পর্কে গুঞ্জন যেন সরব হয়ে ওঠে। পাড়ার এক গুরুজন বলল, মা, মেয়ে মানুষের কাজের আবার দরকার কি? বাইরে বের না হওয়াই মেয়েদের ভালো। পুরুষ মানুষ বাহির সামলাবে আর মেয়ে মানুষ ঘর সামলাবে। হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আফরোজা আস্তে আস্তে বলল আমার এখন দ্রুত যেতে হবে। এদিকে মুখ খুলে কিছু বললে, বলবে, মেয়ে মানুষের এত কথা বলা ভালো না কথা কম বলাই ভালো। এই রীতিনীতি চিরকাল হয়ে এসেছে। সব বাধা প্রতিকূলতা ভেঙ্গে আমি নিজেকে এগিয়ে নিতে চাই। নিজেকে আটকিয়ে রাখবো না এই বাধার কাছে। এগিয়ে যেতেই হবে। অফিসের গেটে দারোয়ান তার দিকে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকায়! আফরোজা এসব উপেক্ষা করে এগিয়ে যায়। সাহস নিয়ে ভেতরে ঢুকে ইন্টারভিউ বোর্ডে বসা তিনজন পুরুষকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সালাম দেয়। তারা তার যোগ্যতা দেখে চমৎকৃত হলেও একজনের চোখে সন্দেহ ঝিলিক দেয়। আপনি তো অনেক দূর থেকে আসবেন। রাতের শিফটে কাজ করার প্রস্তুতি আছে? জিজ্ঞেস করলেন। অবশ্যই, আফরোজা দৃঢ় কণ্ঠে বলল। যাতে তার পেশাদারিত্ব নিয়ে কারও সন্দেহ না থাকে। অন্য একজন বললেন, এটা একটা চ্যালেঞ্জিং কাজ, অনেক চাপ! আফরোজা সরাসরি তাকিয়ে বলল, স্যার, চ্যালেঞ্জ জেনেই এসেছি। আমি সফল হবো। আমাকে সুযোগ দিন, প্রমাণ করে দেখাব। তার দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাসের কাছে হার মানে তাদের পূর্বধারণা। সে চাকরিটি পেয়ে যায়।

বাসায় ফিরে সবাইকে খবরটা দিতেই প্রথমে নীরবতা, তারপর অনিচ্ছার এক পরোক্ষ ঢেউ। কিন্তু আফরোজা স্পষ্ট করে বলল, আমি এই চাকরি নিয়েছি। এটা আমার কর্মজীবনের অগ্রগতি। আমি আমার উন্নতিতে আপনাদের সমর্থন আশা করি। পরিবারের সকলেই তাকে সমর্থন করলো।
প্রথম দিন কাজ শেষে আফরোজা যখন বাসায় ফিরল, তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়ে গেছে। ক্লান্তির বদলে শরীরজুড়ে এক গভীর প্রশান্তি। সে অনুভব করে, আজ সে শুধু চাকরি পায়নি, আজ তার চারপাশে শতাব্দীপ্রাচীন যে অদৃশ্য প্রাচীর গড়ে উঠেছিল, তার প্রথম ইটটি সরাতে পেরেছে।
সে বুঝতে পারে, নারীর স্বাধীনতা আবিষ্কারের প্রথম শর্তই হলো—নিজের চারপাশের কুসংস্কার ও সীমাবদ্ধতার দেয়াল ভাঙা। একবার সেই দেয়াল ভাঙতে শুরু করলে, তাকে আর থামানো যাবে না। যে প্রাচীর সে নিজেই মেনে নিয়েছিল সমাজের কথায়, আজ সে সেখানেই ফাটল ধরিয়েছে। কুসংস্কার, প্রতিকূলতা ভেঙ্গে দিয়ে এগিয়ে যেতে পারলে উন্নতির অগ্রগতিতে দাঁড়াতে পারবে।
